ঢাকা ০৯:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ জুন ২০২৪, ৭ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

চাঁদপুরের ৩টি জুট মিলের সবগুলোই বন্ধ ॥ বেকার সহস্রাধীক শ্রমিক

  • আপডেট: ০৮:১৭:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অগাস্ট ২০১৯
  • ১০

বিশেষ প্রতিবেদক॥
দেড়-দুইমাস ধরে বন্ধ রয়েছে চাঁদপুর শহরের স্বনামধন্য পুরাণবাজার ডাব্লিউ রহমান জুট মিলস্ ও স্টার আলকায়েদ জুট মিলস্ লিঃ-এর উৎপাদন। এর আগে প্রায় বছর দুয়েক ধরে দেনার দায়ে বন্ধ রয়েছে হাজীগঞ্জ জুট স্পিনিং মিল এতে এসব মিলের প্রায় কয়েক সহ¯্রাধীক শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা বেকার হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। সামনে ঈদ, আদৌ মিল ৩টি চালু হবে কি না, পাওনা বেতন পাবে কিনা এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন শ্রমিকরা।
ডাব্লিউ রহমান জুট মিলের ভাড়াটিয়া সাহারা জুট মিলের প্রোডাকশনের দায়িত্বে থাকা নাহিদ শেখ জানান, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ৩ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। শ্রমিকরা পাবে ১২ দিনের মজুরি। গত ২১ জুন সকালে কোনো কারণ উল্লেখ না করে নোটিস টানিয়ে মিলের উৎপাদন বন্ধ করে দেয় ভাড়াটিয়া ঢাকা লালমাটিয়ার সাহারা জুট মিল কর্তৃপক্ষ।
ডাব্লিউ রহমান জুট মিলে পাট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক প্রতিনিধি বিশ্বনাথ কুমার রনি জানান, সাহারা জুট মিলের কাছে আমরা পাট বাবদ ৪৩ লাখ টাকা পাবো। তারা বলছে, তাদের ফান্ড নেই। পাট বেপারীদের টাকা মেরে দিয়ে সাহারা জুট মিলের মালিক পক্ষের লোকজন পালিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা বশির মিয়া জানান, প্রকৃত মিল মালিকরা মিল চালালে এ সমস্যা হতো না।
অপরদিকে সাবেক এমপি ড. মোহাম্মদ শামছুল হক ভূঁইয়ার মালিকানাধীন স্টার আল-কায়েদ জুট মিলও প্রায় দেড় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এ মিলের নোটিস বোর্ডে মহাব্যবস্থাপক স্বাক্ষরিত একটি নোটিস টানিয়ে মিলের উৎপাদন বন্ধ করা হয়। নোটিসে জানানো হয়, মিলের রিপেয়ার্স ও ম্যানন্টেইন্স কাজের জন্যে গত ১ জুলাই তারিখ থেকে মিল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্টার আলকায়েদ মিল কর্তৃপক্ষ। মিলটি আগামী ২৫ আগস্ট অর্থাৎ ঈদের পর যথারীতি চালু হবে বলে উল্লেখ করা হয়।
ডাব্লিউ রহমান জুট মিল ব্যবস্থাপক মাহমুদুল হাসান জানান, দুই বছর চুক্তিতে তাদের মিলটি সাহারা জুট মিল কর্তৃপক্ষকে ভাড়া দেয়া হয়। সেই চুক্তি মতো ২০১৯ সালের ১৬ অক্টোবর হতে মিলটি তারা চালাচ্ছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়নি।
অপরদিকে স্টার আলকায়েদ জুট মিলের ব্যবস্থাপক আবদুল মোতালেব জানান, তাদের মিলের কোনো সমস্যা নেই। রিপেয়ার কাজ শেষ হলে ২৫ আগস্ট থেকে মিল চলবে।
অন্য দিকে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানি নাগরিক হামিদ খান হামিদিয়া জুট মিল নামে এ জুট মিলটি হাজীগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেন।
চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের দক্ষিণ পাশ থেকে শুরু করে সর্বদক্ষিণে ডাকাতিয়ার কোল পর্যন্ত প্রায় ১৮ একর জমির উপর মিলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্বাধীনতার পর মিলটি বন্ধ হয়ে যায়। বিএনপি সরকারের সময় চাঁদপুর-৫(হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তিÑ আসনের সাংসদের মেয়ের জামাই শিল্পপতি শফিকুর রহমান মিলটি সোনালি ব্যাংক থেকে ক্রয় করে নেন। পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে হাজীগঞ্জ জুট স্পিনিং মিল নামে সালাউদ্দিন ও রনি নামে দু’জন মিলটি মাসিক ১ লাখ টাকা ভাড়ায় চালানোর দায়িত্ব নেন। এ মিলের পাটের সুতা ভারত ও রাশিয়া রপ্তানি হতো। মিলটি ভালোই চলছিল। হঠাৎ ভাড়াটিয়া কর্তৃপক্ষ মিলের শ্রমিকদের ১৬ লাখ টাকা ও গার্ডের ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা বেতন বাকী রেখে মিলটি ২০১৮ সালের শেষের দিকে বন্ধ করে দেয়।
উল্লেখ্য, চাঁদপুরে মাত্র ৩টি জুট মিলই রয়েছে। এ ৩টি মিল থেকে পাটের বস্তা, চট ও সুতলি তৈরি হতো। অধিকাংশ পণ্য পাটের বস্তায় ব্যবহার সরকার বাধ্যতামূলক করায় দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকলগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পায়। সে সুবাদে চাঁদপুরের বেসরকারি এ ৩টি পাটকলও আবার চালু হয়। কয়েকশ’ নারী-পুরুষ শ্রমিকের পদচারণায় পুনরায় মুখরিত হয় মিল প্রাঙ্গণ। কিন্তু গেল ঈদুল ফিতরের পর থেকে গত দেড়-দুইমাস মিল চাঁদপুরের দুটি বন্ধ থাকায় সেখানকার পরিবেশ নিরব নিস্তব্ধ থাকতে দেখা যায়।
অপর দিকে হাজীগঞ্জ জুট স্পিনিং মিলটি গত দেড় বছরের মতো বন্ধ থাকায় মিলের যন্ত্রপাতি প্রায় নষ্টের পথে। মিল এলাকায় নেই আগের মতো কোলাহল। মিলের কয়েশ শ্রমিক মানবতের জীবন যাপন করছে।

Tag :
সর্বাধিক পঠিত

চাঁদপুরের ৩টি জুট মিলের সবগুলোই বন্ধ ॥ বেকার সহস্রাধীক শ্রমিক

আপডেট: ০৮:১৭:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অগাস্ট ২০১৯

বিশেষ প্রতিবেদক॥
দেড়-দুইমাস ধরে বন্ধ রয়েছে চাঁদপুর শহরের স্বনামধন্য পুরাণবাজার ডাব্লিউ রহমান জুট মিলস্ ও স্টার আলকায়েদ জুট মিলস্ লিঃ-এর উৎপাদন। এর আগে প্রায় বছর দুয়েক ধরে দেনার দায়ে বন্ধ রয়েছে হাজীগঞ্জ জুট স্পিনিং মিল এতে এসব মিলের প্রায় কয়েক সহ¯্রাধীক শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা বেকার হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। সামনে ঈদ, আদৌ মিল ৩টি চালু হবে কি না, পাওনা বেতন পাবে কিনা এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন শ্রমিকরা।
ডাব্লিউ রহমান জুট মিলের ভাড়াটিয়া সাহারা জুট মিলের প্রোডাকশনের দায়িত্বে থাকা নাহিদ শেখ জানান, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ৩ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। শ্রমিকরা পাবে ১২ দিনের মজুরি। গত ২১ জুন সকালে কোনো কারণ উল্লেখ না করে নোটিস টানিয়ে মিলের উৎপাদন বন্ধ করে দেয় ভাড়াটিয়া ঢাকা লালমাটিয়ার সাহারা জুট মিল কর্তৃপক্ষ।
ডাব্লিউ রহমান জুট মিলে পাট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক প্রতিনিধি বিশ্বনাথ কুমার রনি জানান, সাহারা জুট মিলের কাছে আমরা পাট বাবদ ৪৩ লাখ টাকা পাবো। তারা বলছে, তাদের ফান্ড নেই। পাট বেপারীদের টাকা মেরে দিয়ে সাহারা জুট মিলের মালিক পক্ষের লোকজন পালিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা বশির মিয়া জানান, প্রকৃত মিল মালিকরা মিল চালালে এ সমস্যা হতো না।
অপরদিকে সাবেক এমপি ড. মোহাম্মদ শামছুল হক ভূঁইয়ার মালিকানাধীন স্টার আল-কায়েদ জুট মিলও প্রায় দেড় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এ মিলের নোটিস বোর্ডে মহাব্যবস্থাপক স্বাক্ষরিত একটি নোটিস টানিয়ে মিলের উৎপাদন বন্ধ করা হয়। নোটিসে জানানো হয়, মিলের রিপেয়ার্স ও ম্যানন্টেইন্স কাজের জন্যে গত ১ জুলাই তারিখ থেকে মিল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্টার আলকায়েদ মিল কর্তৃপক্ষ। মিলটি আগামী ২৫ আগস্ট অর্থাৎ ঈদের পর যথারীতি চালু হবে বলে উল্লেখ করা হয়।
ডাব্লিউ রহমান জুট মিল ব্যবস্থাপক মাহমুদুল হাসান জানান, দুই বছর চুক্তিতে তাদের মিলটি সাহারা জুট মিল কর্তৃপক্ষকে ভাড়া দেয়া হয়। সেই চুক্তি মতো ২০১৯ সালের ১৬ অক্টোবর হতে মিলটি তারা চালাচ্ছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়নি।
অপরদিকে স্টার আলকায়েদ জুট মিলের ব্যবস্থাপক আবদুল মোতালেব জানান, তাদের মিলের কোনো সমস্যা নেই। রিপেয়ার কাজ শেষ হলে ২৫ আগস্ট থেকে মিল চলবে।
অন্য দিকে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানি নাগরিক হামিদ খান হামিদিয়া জুট মিল নামে এ জুট মিলটি হাজীগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেন।
চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের দক্ষিণ পাশ থেকে শুরু করে সর্বদক্ষিণে ডাকাতিয়ার কোল পর্যন্ত প্রায় ১৮ একর জমির উপর মিলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্বাধীনতার পর মিলটি বন্ধ হয়ে যায়। বিএনপি সরকারের সময় চাঁদপুর-৫(হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তিÑ আসনের সাংসদের মেয়ের জামাই শিল্পপতি শফিকুর রহমান মিলটি সোনালি ব্যাংক থেকে ক্রয় করে নেন। পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে হাজীগঞ্জ জুট স্পিনিং মিল নামে সালাউদ্দিন ও রনি নামে দু’জন মিলটি মাসিক ১ লাখ টাকা ভাড়ায় চালানোর দায়িত্ব নেন। এ মিলের পাটের সুতা ভারত ও রাশিয়া রপ্তানি হতো। মিলটি ভালোই চলছিল। হঠাৎ ভাড়াটিয়া কর্তৃপক্ষ মিলের শ্রমিকদের ১৬ লাখ টাকা ও গার্ডের ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা বেতন বাকী রেখে মিলটি ২০১৮ সালের শেষের দিকে বন্ধ করে দেয়।
উল্লেখ্য, চাঁদপুরে মাত্র ৩টি জুট মিলই রয়েছে। এ ৩টি মিল থেকে পাটের বস্তা, চট ও সুতলি তৈরি হতো। অধিকাংশ পণ্য পাটের বস্তায় ব্যবহার সরকার বাধ্যতামূলক করায় দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকলগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পায়। সে সুবাদে চাঁদপুরের বেসরকারি এ ৩টি পাটকলও আবার চালু হয়। কয়েকশ’ নারী-পুরুষ শ্রমিকের পদচারণায় পুনরায় মুখরিত হয় মিল প্রাঙ্গণ। কিন্তু গেল ঈদুল ফিতরের পর থেকে গত দেড়-দুইমাস মিল চাঁদপুরের দুটি বন্ধ থাকায় সেখানকার পরিবেশ নিরব নিস্তব্ধ থাকতে দেখা যায়।
অপর দিকে হাজীগঞ্জ জুট স্পিনিং মিলটি গত দেড় বছরের মতো বন্ধ থাকায় মিলের যন্ত্রপাতি প্রায় নষ্টের পথে। মিল এলাকায় নেই আগের মতো কোলাহল। মিলের কয়েশ শ্রমিক মানবতের জীবন যাপন করছে।