ঢাকা ১১:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

রমজানের শেষ ১০ দিন:লাইলাতুল ক্বদর এবং ইতিকাফ

  • আপডেট: ০৪:৩৭:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ মে ২০১৯
  • ২০

অনলাইন ডেস্ক:

রমজান মাস পুরোটাই ফজিলতে ভরপুর, তবে শেষ দশকের মর্যাদা ও গুরুত্ব অন্য দিনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। ইবাদাতের বসন্তকাল মাহে রমজানের উৎকৃষ্ট ও শ্রেষ্ঠাংশ হচ্ছে তার শেষ দশক। একে রমজানের সারাংশ ও তার শীর্ষ চূড়া বলেও অভিহিত করা যায়। এ দিনগুলোতে দয়াময়ের পক্ষ থেকে করুণার বারিধারা ও মার্জনার প্রতিশ্রুতি এবং মুক্তির কাংখিত ঘোষণা মুমিন হৃদয়কে ব্যাকুল করে তোলে। এজন্যই মহানবী সা., সাহাবায়ে কেরাম ও বুযুর্গানেদ্বীন এ দশকে ইবাদাতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ যত্নবান থাকতেন।

লাইলাতুল ক্বদর

দিন ও মাস সমূহ সবই সমান, সবই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তারপরও কিছু মুহূর্ত এমন আছে, যার উপর সমগ্র মানব জাতির ভাগ্য নির্ভর করে। পবিত্র হেরা গুহায় মহানবীর (সা.) উপর আল্লাহ’র কালাম নাযিল হওয়া ছিল সেই মুহূর্ত। সেই মুহূর্তেই ঘটেছিল মানব ইতিহাসের সেই সবচেয়ে বিরাট ঘটনা এবং এটিই মাহে রমজানের বড়ত্ব, মহত্ব ও গুরুত্বের মূল রহস্য। যে রাত্রিতে মহাগ্রন্থ আল কোরআন নাযিল হয়, সে রাত্রিটিই হলো লাইলাতুল কোরআন। এই রাতটি অশেষ বরকতপূর্ণ রাত। পবিত্র কোরআন ও হাদীসে মহিমান্বিত এ রাতের অনেক মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছ, এটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আর এই গুরুত্বপূর্ণ রাতটিকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে মাহে রমজানের শেষ দশদিনের মধ্যে।

কোরআন অবতরণ এবং শবে কদরের ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহ কোরআনুল কারিমে ‘সুরা কদর’ নামে একটি সুরা নাজিল করেছেন। তাতে তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি কদর (মর্যাদাপূর্ণ) রজনীতে। আপনি কি জানেন মহিমাময় কদর রজনী কী? মহিমান্বিত কদর রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ হজরত জিবরাইল (আ.) সমভিব্যাহারে অবতরণ করেন; তঁাদের প্রভু মহান আল্লাহর নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে, সব বিষয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে। এই শান্তির ধারা চলতে থাকে উষার উদয় পর্যন্ত।’ (সুরা-৯৭ কদর, আয়াত: ১-৫)।

কোরআনেরই সংস্পর্শে একটি সাধারণ রাত ‘লাইলাতুল কদর’ বা ‘শবে কদর’ রজনীর অসাধারণ সম্মানে ভূষিত হয়েছে। কোরআনের সঙ্গে যার যতটুকু সম্পর্ক ও সান্নিধ্য থাকবে, তিনি ততটুকু সম্মানিত ও মর্যাদার অধিকারী হবেন। প্রিয় হাবিব (সা.) বলেন, ‘কোরআনওয়ালাই আল্লাহওয়ালা এবং তাঁর খাস ব্যক্তি ও পরিবারভুক্ত’ (বুখারি)। হাদিস শরিফে আরও এসেছে, ‘যার অন্তরে কোরআনের সামান্যতম অংশও নেই, সে যেন এক বিরান বাড়ি।’ (মুসলিম)।

হজরত উবাদা ইবনে সামিত (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) শবে কদরের সংবাদ দেওয়ার জন্য বের হলেন, দেখলেন দুজন মুসলমান ঝগড়া–বিবাদে লিপ্ত। তারপর তিনি বললেন, ‘শবে কদর সম্বন্ধে খবর দেওয়ার জন্য আমি বের হয়েছিলাম, তোমাদের অমুক অমুক বিবাদে লিপ্ত হলো, আর তা আমা থেকে তুলে নেওয়া হলো। হয়তো এটাই তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। এখন তোমরা তা রমজানের শেষ দশকে বিজোড় রাতগুলোতে তালাশ করো।’ (বুখারি)।

কোরআন-হাদিসে ইতেকাফ

ইতেকাফ শরিয়াসম্মত একটি আমল হওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি ইবরাহিম ও ইসমাঈলকে আদেশ দিয়েছিলাম যেন তারা আমার ঘরকে (কাবা) তাওয়াফকারীদের জন্য,ইতেকাফকারীদের জন্য ও (সর্বোপরি তার নামে) রুকু-সিজদাহকারীদের জন্য পবিত্র রাখে’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১২৫)।

‘আর মসজিদে যখন তোমরা ইতেকাফ অবস্থায় থাকবে তখন স্ত্রী-সম্ভোগ থেকে বিরত থেকো। সিয়ামের ব্যাপারে এগুলোই হলো আল্লাহর সীমারেখা’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসংখ্য হাদিস ইতেকাফ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, তার মধ্য হতে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করা হল: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করতেন। (বুখারি-২০২৫)

রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষের দশকে ইতেকাফ করেছেন, ইন্তেকাল পর্যন্ত। এরপর তাঁর স্ত্রীগণ ইতেকাফ করেছেন। (বুখারি-২০২৬)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি রমজানে দশ দিন এতেকাফ করতেন, তবে যে বছর তিনি পরলোকগত হন, সে বছর তিনি বিশ দিন ইতেকাফে কাটান। (তিরমিযী-৮০৮)

ইতেকাফের ফজিলত

ইতেকাফ আল্লাহর নৈকট্য লাভের সহজ উপায়। আল্লাহর সঙ্গে সুনিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যম। কারণ, মানুষ যখন সংসার জগতের কর্মকাণ্ড- থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে আল্লাহর ঘরে ইবাদতের নিমিত্তে আত্মনিয়োগ করবে,তখন দয়াবান স্রষ্টা কি তার থেকে বিমুখ থাকতে পারেন? তিনি তো ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, ‘বান্দা আমার দিকে একহাত অগ্রসর হলে আমি তার দিকে দুইহাত অগ্রসর হই। আমার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।’

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, ‘কেউ যখন আল্লাহর ঘর মসজিদে অবস্থান নেয় তখন আল্লাহ তায়ালা এত বেশি আনন্দিত হন যেমন বিদেশ-বিভুঁই থেকে কেউ বাড়িতে এলে আপনজনরা আনন্দিত হয়ে থাকে।’ (তারগিব-তারহিব : ৩২২)।

অন্য হাদিসে এসেছে,যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন ইতেকাফ করবে আল্লাহ তায়ালা তার এবং জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। অর্থাৎ আসমান ও জমিনের দূরত্ব থেকে অধিক দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। (শোয়াবুল ঈমান,হাদিস: ৩৯৬৫) ।

আলী বিন হোসাইন (রা.) নিজ পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করে,তা দুই হজ ও দুই ওমরার সমান’ (বায়হাকি)।

ইতিকাফের প্রকারভেদ

সুন্নাত ইতিকাফ: রমজানের শেষ দশকের ইতিকাফ। অর্থাৎ ২০ রমজানের সূর্য ডোবার আগ মুহূর্ত থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠা পর্যন্ত মসজিদে ইতিকাফ করা। এ ধরনের ইতিকাফকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা কিফায়া বলা হয়। গ্রাম বা মহল্লাবাসীর পক্ষে কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তি এই ইতিকাফ করলে সবার পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যাবে।

ওয়াজিব ইতিকাফ: নজর বা মানতের ইতিকাফ ওয়াজিব। যেমন কেউ বলল যে, আমার অমুক কাজ সমাধান হলে আমি এতদিন ইতিকাফ করব অথবা কোনো কাজের শর্ত উল্লেখ না করেই বলল, আমি একদিন অবশ্যই ইতিকাফ করব। যতদিন শর্ত করা হবে ততদিন ইতিকাফ করা ওয়াজিব। ওয়াজিব ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা শর্ত। সুন্নাত ইতিকাফ ভঙ্গ করলে তা পালন করা ওয়াজিব হয়ে যায়। নফল ইতিকাফ: সাধারণভাবে যেকোনো সময় ইতিকাফ করাকে নফল ইতেকাফ বলে। এর জন্য কোনো দিন কিংবা সময়ের পরিমাপ নেই। অল্প সময়ের জন্যও ইতিকাফ করা যেতে পারে। এ জন্য মসজিদে প্রবেশের পূর্বে ইতিকাফের নিয়ত করে প্রবেশ করা ভালো।

মহিলাদের ইতিকাফ : মহিলারা ঘরের যে অংশে সাধারণত নামাজ পড়া হয় তেমন কোনো অংশকে ইতিকাফের জন্য নির্দিষ্ট করে দশ দিন কিংবা কম সময়ের জন্য ইতিকাফের নিয়ত করে সেই জায়গায় বসে ইবাদত বন্দেগি শুরু করবেন। শরয়ী কোনো ওজর ছাড়া সেখান থেকে উঠে অন্যত্র না যাওয়া ভালো। (রাতে সেখানেই ঘুমাবেন)। ইতিকাফ অবস্থায় যদি মহিলাদের মাসিক শুরু হয়ে যায় তাহলে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।

ইতিকাফে করণীয়

ইতিকাফ অবস্থায় করণীয় হচ্ছে- ১. বেশি বেশি আল্লাহর জিকির-আজকার করা, ২. নফল নামাজ আদায় করা, ৩. কোরআন তেলাওয়াত করা, ৪. দ্বীনি ওয়াজ-নসিহত শোনা ও ৫. ধর্মীয় গ্রন্থাবলী পাঠ করা।

ইতিকাফে বর্জনীয়

ইতিকাফ অবস্থায় যেসব কাজ বর্জনীয়- ১. ইতিকাফ অবস্থায় বিনা ওজরে মসজিদের বাইরে যাওয়া, ২. দুনিয়াবি আলোচনায় মগ্ন হওয়া, ৩. কোনো জিনিস বেচাকেনা করা, ৪. ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ করা, ৫. ওজরবশত বাইরে গিয়ে প্রয়োজনাতিরিক্ত বিলম্ব করা ও ৬. স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করা। এসব কাজ করলে ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যায়।

ইতিকাফ দীর্ঘ সময় ধরে করা উত্তম,বিশেষত মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ অবস্থায় থাকায় ‘লাইলাতুল কদর’ বা হাজার মাসের শ্রেষ্ঠতম ভাগ্যের রজনী লাভের সৌভাগ্য হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের পবিত্র মাহে রমজানে মসজিদে ইতিকাফ করার মাধ্যমে গুনাহের পাপরাশি থেকে বেঁচে থেকে অশেষ নেকি লাভের মোক্ষম সুযোগ।

Tag :
সর্বাধিক পঠিত

ধর্ষণের মামলায় মাওলানা নাছির পাটোয়ারীকে আটক করলো র‌্যাব

রমজানের শেষ ১০ দিন:লাইলাতুল ক্বদর এবং ইতিকাফ

আপডেট: ০৪:৩৭:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ মে ২০১৯

অনলাইন ডেস্ক:

রমজান মাস পুরোটাই ফজিলতে ভরপুর, তবে শেষ দশকের মর্যাদা ও গুরুত্ব অন্য দিনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। ইবাদাতের বসন্তকাল মাহে রমজানের উৎকৃষ্ট ও শ্রেষ্ঠাংশ হচ্ছে তার শেষ দশক। একে রমজানের সারাংশ ও তার শীর্ষ চূড়া বলেও অভিহিত করা যায়। এ দিনগুলোতে দয়াময়ের পক্ষ থেকে করুণার বারিধারা ও মার্জনার প্রতিশ্রুতি এবং মুক্তির কাংখিত ঘোষণা মুমিন হৃদয়কে ব্যাকুল করে তোলে। এজন্যই মহানবী সা., সাহাবায়ে কেরাম ও বুযুর্গানেদ্বীন এ দশকে ইবাদাতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ যত্নবান থাকতেন।

লাইলাতুল ক্বদর

দিন ও মাস সমূহ সবই সমান, সবই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তারপরও কিছু মুহূর্ত এমন আছে, যার উপর সমগ্র মানব জাতির ভাগ্য নির্ভর করে। পবিত্র হেরা গুহায় মহানবীর (সা.) উপর আল্লাহ’র কালাম নাযিল হওয়া ছিল সেই মুহূর্ত। সেই মুহূর্তেই ঘটেছিল মানব ইতিহাসের সেই সবচেয়ে বিরাট ঘটনা এবং এটিই মাহে রমজানের বড়ত্ব, মহত্ব ও গুরুত্বের মূল রহস্য। যে রাত্রিতে মহাগ্রন্থ আল কোরআন নাযিল হয়, সে রাত্রিটিই হলো লাইলাতুল কোরআন। এই রাতটি অশেষ বরকতপূর্ণ রাত। পবিত্র কোরআন ও হাদীসে মহিমান্বিত এ রাতের অনেক মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছ, এটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আর এই গুরুত্বপূর্ণ রাতটিকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে মাহে রমজানের শেষ দশদিনের মধ্যে।

কোরআন অবতরণ এবং শবে কদরের ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহ কোরআনুল কারিমে ‘সুরা কদর’ নামে একটি সুরা নাজিল করেছেন। তাতে তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি কদর (মর্যাদাপূর্ণ) রজনীতে। আপনি কি জানেন মহিমাময় কদর রজনী কী? মহিমান্বিত কদর রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ হজরত জিবরাইল (আ.) সমভিব্যাহারে অবতরণ করেন; তঁাদের প্রভু মহান আল্লাহর নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে, সব বিষয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে। এই শান্তির ধারা চলতে থাকে উষার উদয় পর্যন্ত।’ (সুরা-৯৭ কদর, আয়াত: ১-৫)।

কোরআনেরই সংস্পর্শে একটি সাধারণ রাত ‘লাইলাতুল কদর’ বা ‘শবে কদর’ রজনীর অসাধারণ সম্মানে ভূষিত হয়েছে। কোরআনের সঙ্গে যার যতটুকু সম্পর্ক ও সান্নিধ্য থাকবে, তিনি ততটুকু সম্মানিত ও মর্যাদার অধিকারী হবেন। প্রিয় হাবিব (সা.) বলেন, ‘কোরআনওয়ালাই আল্লাহওয়ালা এবং তাঁর খাস ব্যক্তি ও পরিবারভুক্ত’ (বুখারি)। হাদিস শরিফে আরও এসেছে, ‘যার অন্তরে কোরআনের সামান্যতম অংশও নেই, সে যেন এক বিরান বাড়ি।’ (মুসলিম)।

হজরত উবাদা ইবনে সামিত (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) শবে কদরের সংবাদ দেওয়ার জন্য বের হলেন, দেখলেন দুজন মুসলমান ঝগড়া–বিবাদে লিপ্ত। তারপর তিনি বললেন, ‘শবে কদর সম্বন্ধে খবর দেওয়ার জন্য আমি বের হয়েছিলাম, তোমাদের অমুক অমুক বিবাদে লিপ্ত হলো, আর তা আমা থেকে তুলে নেওয়া হলো। হয়তো এটাই তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। এখন তোমরা তা রমজানের শেষ দশকে বিজোড় রাতগুলোতে তালাশ করো।’ (বুখারি)।

কোরআন-হাদিসে ইতেকাফ

ইতেকাফ শরিয়াসম্মত একটি আমল হওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি ইবরাহিম ও ইসমাঈলকে আদেশ দিয়েছিলাম যেন তারা আমার ঘরকে (কাবা) তাওয়াফকারীদের জন্য,ইতেকাফকারীদের জন্য ও (সর্বোপরি তার নামে) রুকু-সিজদাহকারীদের জন্য পবিত্র রাখে’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১২৫)।

‘আর মসজিদে যখন তোমরা ইতেকাফ অবস্থায় থাকবে তখন স্ত্রী-সম্ভোগ থেকে বিরত থেকো। সিয়ামের ব্যাপারে এগুলোই হলো আল্লাহর সীমারেখা’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসংখ্য হাদিস ইতেকাফ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, তার মধ্য হতে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করা হল: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করতেন। (বুখারি-২০২৫)

রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষের দশকে ইতেকাফ করেছেন, ইন্তেকাল পর্যন্ত। এরপর তাঁর স্ত্রীগণ ইতেকাফ করেছেন। (বুখারি-২০২৬)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি রমজানে দশ দিন এতেকাফ করতেন, তবে যে বছর তিনি পরলোকগত হন, সে বছর তিনি বিশ দিন ইতেকাফে কাটান। (তিরমিযী-৮০৮)

ইতেকাফের ফজিলত

ইতেকাফ আল্লাহর নৈকট্য লাভের সহজ উপায়। আল্লাহর সঙ্গে সুনিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যম। কারণ, মানুষ যখন সংসার জগতের কর্মকাণ্ড- থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে আল্লাহর ঘরে ইবাদতের নিমিত্তে আত্মনিয়োগ করবে,তখন দয়াবান স্রষ্টা কি তার থেকে বিমুখ থাকতে পারেন? তিনি তো ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, ‘বান্দা আমার দিকে একহাত অগ্রসর হলে আমি তার দিকে দুইহাত অগ্রসর হই। আমার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।’

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, ‘কেউ যখন আল্লাহর ঘর মসজিদে অবস্থান নেয় তখন আল্লাহ তায়ালা এত বেশি আনন্দিত হন যেমন বিদেশ-বিভুঁই থেকে কেউ বাড়িতে এলে আপনজনরা আনন্দিত হয়ে থাকে।’ (তারগিব-তারহিব : ৩২২)।

অন্য হাদিসে এসেছে,যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন ইতেকাফ করবে আল্লাহ তায়ালা তার এবং জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। অর্থাৎ আসমান ও জমিনের দূরত্ব থেকে অধিক দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। (শোয়াবুল ঈমান,হাদিস: ৩৯৬৫) ।

আলী বিন হোসাইন (রা.) নিজ পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করে,তা দুই হজ ও দুই ওমরার সমান’ (বায়হাকি)।

ইতিকাফের প্রকারভেদ

সুন্নাত ইতিকাফ: রমজানের শেষ দশকের ইতিকাফ। অর্থাৎ ২০ রমজানের সূর্য ডোবার আগ মুহূর্ত থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠা পর্যন্ত মসজিদে ইতিকাফ করা। এ ধরনের ইতিকাফকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা কিফায়া বলা হয়। গ্রাম বা মহল্লাবাসীর পক্ষে কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তি এই ইতিকাফ করলে সবার পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যাবে।

ওয়াজিব ইতিকাফ: নজর বা মানতের ইতিকাফ ওয়াজিব। যেমন কেউ বলল যে, আমার অমুক কাজ সমাধান হলে আমি এতদিন ইতিকাফ করব অথবা কোনো কাজের শর্ত উল্লেখ না করেই বলল, আমি একদিন অবশ্যই ইতিকাফ করব। যতদিন শর্ত করা হবে ততদিন ইতিকাফ করা ওয়াজিব। ওয়াজিব ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা শর্ত। সুন্নাত ইতিকাফ ভঙ্গ করলে তা পালন করা ওয়াজিব হয়ে যায়। নফল ইতিকাফ: সাধারণভাবে যেকোনো সময় ইতিকাফ করাকে নফল ইতেকাফ বলে। এর জন্য কোনো দিন কিংবা সময়ের পরিমাপ নেই। অল্প সময়ের জন্যও ইতিকাফ করা যেতে পারে। এ জন্য মসজিদে প্রবেশের পূর্বে ইতিকাফের নিয়ত করে প্রবেশ করা ভালো।

মহিলাদের ইতিকাফ : মহিলারা ঘরের যে অংশে সাধারণত নামাজ পড়া হয় তেমন কোনো অংশকে ইতিকাফের জন্য নির্দিষ্ট করে দশ দিন কিংবা কম সময়ের জন্য ইতিকাফের নিয়ত করে সেই জায়গায় বসে ইবাদত বন্দেগি শুরু করবেন। শরয়ী কোনো ওজর ছাড়া সেখান থেকে উঠে অন্যত্র না যাওয়া ভালো। (রাতে সেখানেই ঘুমাবেন)। ইতিকাফ অবস্থায় যদি মহিলাদের মাসিক শুরু হয়ে যায় তাহলে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।

ইতিকাফে করণীয়

ইতিকাফ অবস্থায় করণীয় হচ্ছে- ১. বেশি বেশি আল্লাহর জিকির-আজকার করা, ২. নফল নামাজ আদায় করা, ৩. কোরআন তেলাওয়াত করা, ৪. দ্বীনি ওয়াজ-নসিহত শোনা ও ৫. ধর্মীয় গ্রন্থাবলী পাঠ করা।

ইতিকাফে বর্জনীয়

ইতিকাফ অবস্থায় যেসব কাজ বর্জনীয়- ১. ইতিকাফ অবস্থায় বিনা ওজরে মসজিদের বাইরে যাওয়া, ২. দুনিয়াবি আলোচনায় মগ্ন হওয়া, ৩. কোনো জিনিস বেচাকেনা করা, ৪. ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ করা, ৫. ওজরবশত বাইরে গিয়ে প্রয়োজনাতিরিক্ত বিলম্ব করা ও ৬. স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করা। এসব কাজ করলে ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যায়।

ইতিকাফ দীর্ঘ সময় ধরে করা উত্তম,বিশেষত মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ অবস্থায় থাকায় ‘লাইলাতুল কদর’ বা হাজার মাসের শ্রেষ্ঠতম ভাগ্যের রজনী লাভের সৌভাগ্য হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের পবিত্র মাহে রমজানে মসজিদে ইতিকাফ করার মাধ্যমে গুনাহের পাপরাশি থেকে বেঁচে থেকে অশেষ নেকি লাভের মোক্ষম সুযোগ।