ঢাকা ০৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করুন’—হাজীগঞ্জের ইউএনওর দরজা কেন সবার জন্য খোলা

ছবি-ত্রিনদী

সরকারি দপ্তরের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য কতটা খোলা—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুব দূরে যেতে হবে না। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের দরজার সামনে দাঁড়ালেই চোখে পড়বে ব্যতিক্রমী এক নির্দেশনা—‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করুন’। তার নিচে আরও লেখা—‘ধাক্কা দিন’।

সরকারি কর্মকর্তার কক্ষে প্রবেশের আগে যেখানে অনুমতির প্রয়োজন হয়, অনেক সময় দেখা করার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষাও করতে হয়, সেখানে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দরজায় এমন বার্তা নিঃসন্দেহে আলাদা করে নজর কাড়ে। তবে দরজার এই কয়েকটি শব্দের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর পেছনের মানসিকতা—সেবাপ্রত্যাশী মানুষ যেন ভয় বা সংকোচে সরকারি কর্মকর্তার কাছে যেতে পিছপা না হন।

হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বিষয়টি কোনো প্রচারের কৌশল নয়। বরং তাঁর দপ্তরে আসা সাধারণ মানুষের একটি সংকট থেকেই এই উদ্যোগের শুরু।

‘অনেকে ভয়ে অফিসে ঢোকেন না’

‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করুন’ লেখাটি কেন?

প্রশ্নের জবাবে ইউএনও মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেন বলেন, “অনেকেই আমার অফিসে আসেন, কিন্তু ভয়ে অফিসে প্রবেশ করেন না। তাই অফিসের প্রবেশকক্ষের দরজায় ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করুন’ লেখাটি লাগিয়ে দিয়েছি।”

কথাটি ছোট। কিন্তু এর তাৎপর্য বড়। কারণ, সরকারি সেবা নিতে এসে একজন সাধারণ নাগরিক যেন নিজেকে অসহায় বা অনাহূত মনে না করেন—এই ধারণাই তাঁর কথায় ফুটে ওঠে।

উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে নানা সমস্যা নিয়ে মানুষ তাঁর কাছে আসেন। কারও জমি নিয়ে বিরোধ, কারও প্রশাসনিক সেবা পেতে জটিলতা, কেউ বা কোনো ব্যক্তিগত দুর্ভোগের কথা জানাতে আসেন। তিনি তাঁদের কথা শোনেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেন।

এমন আচরণে স্থানীয়দের একটি অংশের কাছে ইউএনওর পরিচিতি তৈরি হয়েছে ‘জনবান্ধব কর্মকর্তা’ হিসেবে।

শুধু দরজা খোলা নয়, মাঠেও সক্রিয়

তবে ইবনে আল জায়েদ হোসেনের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন শুধু তাঁর অফিসের দরজায় লেখা কয়েকটি শব্দ দিয়ে করলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

হাজীগঞ্জ বাজারের দীর্ঘদিনের যানজট ছিল তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। ব্যস্ত এই বাজারে ফুটপাত দখল, সড়কের পাশে দোকানপাট, হকার, অটোরিকশা ও বিভিন্ন যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত অবস্থান—সব মিলিয়ে যানজট ছিল নিত্যদিনের দুর্ভোগ।

২০২৫ সালের মার্চে উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার পাশাপাশি যানজট নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তৎকালীন অভিযানের সময় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বাজারে থাকলে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হলেও তাঁদের চলে যাওয়ার পর আগের চিত্র ফিরে আসার কথাও তখন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে।

অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু অভিযান চালিয়ে সমাধানের নয়—এটি ছিল ধারাবাহিক তদারকি ও স্থানীয় অংশীজনদের সম্পৃক্ত করার বিষয়।

সেই জায়গায় প্রশাসনের উদ্যোগও ধীরে ধীরে বদলেছে। বাজারের যানজট নিরসনে ব্যবসায়ী, হকার, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সুধীজনদের নিয়ে মতবিনিময় করা হয়েছে। বাস থামানো ও যাত্রী ওঠানামার নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণসহ একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০২৬ সালেও বাজারে উচ্ছেদ ও মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম চালানোর খবর পাওয়া গেছে। জুনে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে অভিযান পরিচালনার সময় জরিমানার পাশাপাশি মালামাল জব্দ করা হয়। ইউএনও তখন জানান, পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল এবং যানজট কমাতে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এতে একটি বিষয় স্পষ্ট—হাজীগঞ্জ বাজারের যানজটের মতো পুরোনো সমস্যার সমাধানে এককালীন অভিযান নয়, ধারাবাহিক প্রশাসনিক তৎপরতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

যে সমস্যার ‘স্থায়ী সমাধান’ সহজ নয়

হাজীগঞ্জ বাজারকে যানজটমুক্ত রাখার চ্যালেঞ্জ অবশ্য এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। স্থানীয় একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হকার ও অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদের পরও বাজারকে স্থায়ীভাবে যানজটমুক্ত রাখার প্রশ্নটি সামনে রয়েছে। একই প্রতিবেদনে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানেই একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাজের প্রকৃত পরীক্ষা। কারণ, উচ্ছেদ অভিযান চালানো তুলনামূলকভাবে সহজ; কিন্তু উচ্ছেদের পর আবার যাতে একই দখল ফিরে না আসে, তা নিশ্চিত করাই কঠিন।

ইবনে আল জায়েদ হোসেনের কর্মকাণ্ডে অন্তত সেই ধারাবাহিকতার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

নির্বাচনেও প্রশাসনিক দক্ষতার পরীক্ষা

সম্প্রতি হাজীগঞ্জ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচন নিয়েও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। নির্বাচনকে ঘিরে নানা আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের ফল ঘোষণা করেন ইউএনও ইবনে আল জায়েদ হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা।

একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার জন্য এমন নির্বাচন শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি স্থানীয় বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থ, প্রত্যাশা ও মতপার্থক্যের মধ্যেও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার একটি পরীক্ষা।

সেখানে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা থাকে একটাই—কেউ যেন মনে না করেন, প্রশাসন কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করছে।

মাদক, কিশোর গ্যাং ও ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধেও তৎপরতা

হাজীগঞ্জকে মাদক, কিশোর গ্যাং ও ইভটিজিংমুক্ত রাখতে উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও এসব উদ্যোগে গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রশাসনের কাজ কেবল অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়; অপরাধের পরিবেশ তৈরি হয় এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করাও তার দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

একজন ইউএনও কতটা ‘জনপ্রতিনিধির মতো’ হতে পারেন?

ইউএনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নন। তাঁর দায়িত্বও জনপ্রতিনিধির দায়িত্বের মতো নয়। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ যখন তাঁর সমস্যার কথা বলার জন্য সরকারি কর্মকর্তার কাছে যান, তখন তিনি মূলত রাষ্ট্রের কাছেই যান।

সেই জায়গায় একজন কর্মকর্তার আচরণই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের মুখ।

হাজীগঞ্জের অনেক সেবাপ্রত্যাশীর কাছে ইবনে আল জায়েদ হোসেনের এই ভূমিকার কারণেই তাঁর প্রতি আলাদা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কেউ সমস্যার কথা বলতে গিয়ে যেন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ফিরে না যান—দরজায় লেখা ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করুন’ যেন সেই প্রত্যাশারই প্রতীক।

দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতা

২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর হাতিয়া উপজেলা থেকে বদলি হয়ে হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেন। এর আগে তিনি কচুয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার হিসেবে দুই বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেন।

হাজীগঞ্জে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নাগরিক সেবা সহজ করা, বাজার ব্যবস্থাপনা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে তাঁর তৎপরতা স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে।

তবে একজন কর্মকর্তার মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত তাঁর পদ বা প্রচারণায় নয়—মানুষ তাঁর দপ্তরে গিয়ে কী ধরনের আচরণ পাচ্ছেন, সমস্যার কতটা সমাধান হচ্ছে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে—তার ওপরই নির্ভর করে।

হাজীগঞ্জের ইউএনওর কক্ষের দরজায় তাই শুধু একটি নির্দেশনা লেখা নেই। সেখানে যেন একটি প্রশাসনিক দর্শনও লেখা আছে—

সরকারি অফিসে আসা মানুষটি ‘সেবাপ্রার্থী’; তিনি অনাহূত নন।

আর সেই কারণেই হয়তো দরজায় লেখা—‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করুন।’

ট্যাগস :
জনপ্রিয়

রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিবুল গ্রেপ্তার

‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করুন’—হাজীগঞ্জের ইউএনওর দরজা কেন সবার জন্য খোলা

আপডেট : ০৯:৫৬:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সরকারি দপ্তরের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য কতটা খোলা—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুব দূরে যেতে হবে না। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের দরজার সামনে দাঁড়ালেই চোখে পড়বে ব্যতিক্রমী এক নির্দেশনা—‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করুন’। তার নিচে আরও লেখা—‘ধাক্কা দিন’।

সরকারি কর্মকর্তার কক্ষে প্রবেশের আগে যেখানে অনুমতির প্রয়োজন হয়, অনেক সময় দেখা করার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষাও করতে হয়, সেখানে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দরজায় এমন বার্তা নিঃসন্দেহে আলাদা করে নজর কাড়ে। তবে দরজার এই কয়েকটি শব্দের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর পেছনের মানসিকতা—সেবাপ্রত্যাশী মানুষ যেন ভয় বা সংকোচে সরকারি কর্মকর্তার কাছে যেতে পিছপা না হন।

হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বিষয়টি কোনো প্রচারের কৌশল নয়। বরং তাঁর দপ্তরে আসা সাধারণ মানুষের একটি সংকট থেকেই এই উদ্যোগের শুরু।

‘অনেকে ভয়ে অফিসে ঢোকেন না’

‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করুন’ লেখাটি কেন?

প্রশ্নের জবাবে ইউএনও মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেন বলেন, “অনেকেই আমার অফিসে আসেন, কিন্তু ভয়ে অফিসে প্রবেশ করেন না। তাই অফিসের প্রবেশকক্ষের দরজায় ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করুন’ লেখাটি লাগিয়ে দিয়েছি।”

কথাটি ছোট। কিন্তু এর তাৎপর্য বড়। কারণ, সরকারি সেবা নিতে এসে একজন সাধারণ নাগরিক যেন নিজেকে অসহায় বা অনাহূত মনে না করেন—এই ধারণাই তাঁর কথায় ফুটে ওঠে।

উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে নানা সমস্যা নিয়ে মানুষ তাঁর কাছে আসেন। কারও জমি নিয়ে বিরোধ, কারও প্রশাসনিক সেবা পেতে জটিলতা, কেউ বা কোনো ব্যক্তিগত দুর্ভোগের কথা জানাতে আসেন। তিনি তাঁদের কথা শোনেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেন।

এমন আচরণে স্থানীয়দের একটি অংশের কাছে ইউএনওর পরিচিতি তৈরি হয়েছে ‘জনবান্ধব কর্মকর্তা’ হিসেবে।

শুধু দরজা খোলা নয়, মাঠেও সক্রিয়

তবে ইবনে আল জায়েদ হোসেনের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন শুধু তাঁর অফিসের দরজায় লেখা কয়েকটি শব্দ দিয়ে করলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

হাজীগঞ্জ বাজারের দীর্ঘদিনের যানজট ছিল তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। ব্যস্ত এই বাজারে ফুটপাত দখল, সড়কের পাশে দোকানপাট, হকার, অটোরিকশা ও বিভিন্ন যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত অবস্থান—সব মিলিয়ে যানজট ছিল নিত্যদিনের দুর্ভোগ।

২০২৫ সালের মার্চে উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার পাশাপাশি যানজট নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তৎকালীন অভিযানের সময় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বাজারে থাকলে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হলেও তাঁদের চলে যাওয়ার পর আগের চিত্র ফিরে আসার কথাও তখন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে।

অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু অভিযান চালিয়ে সমাধানের নয়—এটি ছিল ধারাবাহিক তদারকি ও স্থানীয় অংশীজনদের সম্পৃক্ত করার বিষয়।

সেই জায়গায় প্রশাসনের উদ্যোগও ধীরে ধীরে বদলেছে। বাজারের যানজট নিরসনে ব্যবসায়ী, হকার, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সুধীজনদের নিয়ে মতবিনিময় করা হয়েছে। বাস থামানো ও যাত্রী ওঠানামার নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণসহ একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০২৬ সালেও বাজারে উচ্ছেদ ও মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম চালানোর খবর পাওয়া গেছে। জুনে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে অভিযান পরিচালনার সময় জরিমানার পাশাপাশি মালামাল জব্দ করা হয়। ইউএনও তখন জানান, পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল এবং যানজট কমাতে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এতে একটি বিষয় স্পষ্ট—হাজীগঞ্জ বাজারের যানজটের মতো পুরোনো সমস্যার সমাধানে এককালীন অভিযান নয়, ধারাবাহিক প্রশাসনিক তৎপরতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

যে সমস্যার ‘স্থায়ী সমাধান’ সহজ নয়

হাজীগঞ্জ বাজারকে যানজটমুক্ত রাখার চ্যালেঞ্জ অবশ্য এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। স্থানীয় একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হকার ও অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদের পরও বাজারকে স্থায়ীভাবে যানজটমুক্ত রাখার প্রশ্নটি সামনে রয়েছে। একই প্রতিবেদনে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানেই একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাজের প্রকৃত পরীক্ষা। কারণ, উচ্ছেদ অভিযান চালানো তুলনামূলকভাবে সহজ; কিন্তু উচ্ছেদের পর আবার যাতে একই দখল ফিরে না আসে, তা নিশ্চিত করাই কঠিন।

ইবনে আল জায়েদ হোসেনের কর্মকাণ্ডে অন্তত সেই ধারাবাহিকতার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

নির্বাচনেও প্রশাসনিক দক্ষতার পরীক্ষা

সম্প্রতি হাজীগঞ্জ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচন নিয়েও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। নির্বাচনকে ঘিরে নানা আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের ফল ঘোষণা করেন ইউএনও ইবনে আল জায়েদ হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা।

একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার জন্য এমন নির্বাচন শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি স্থানীয় বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থ, প্রত্যাশা ও মতপার্থক্যের মধ্যেও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার একটি পরীক্ষা।

সেখানে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা থাকে একটাই—কেউ যেন মনে না করেন, প্রশাসন কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করছে।

মাদক, কিশোর গ্যাং ও ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধেও তৎপরতা

হাজীগঞ্জকে মাদক, কিশোর গ্যাং ও ইভটিজিংমুক্ত রাখতে উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও এসব উদ্যোগে গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রশাসনের কাজ কেবল অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়; অপরাধের পরিবেশ তৈরি হয় এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করাও তার দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

একজন ইউএনও কতটা ‘জনপ্রতিনিধির মতো’ হতে পারেন?

ইউএনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নন। তাঁর দায়িত্বও জনপ্রতিনিধির দায়িত্বের মতো নয়। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ যখন তাঁর সমস্যার কথা বলার জন্য সরকারি কর্মকর্তার কাছে যান, তখন তিনি মূলত রাষ্ট্রের কাছেই যান।

সেই জায়গায় একজন কর্মকর্তার আচরণই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের মুখ।

হাজীগঞ্জের অনেক সেবাপ্রত্যাশীর কাছে ইবনে আল জায়েদ হোসেনের এই ভূমিকার কারণেই তাঁর প্রতি আলাদা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কেউ সমস্যার কথা বলতে গিয়ে যেন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ফিরে না যান—দরজায় লেখা ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করুন’ যেন সেই প্রত্যাশারই প্রতীক।

দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতা

২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর হাতিয়া উপজেলা থেকে বদলি হয়ে হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেন। এর আগে তিনি কচুয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার হিসেবে দুই বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেন।

হাজীগঞ্জে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নাগরিক সেবা সহজ করা, বাজার ব্যবস্থাপনা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে তাঁর তৎপরতা স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে।

তবে একজন কর্মকর্তার মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত তাঁর পদ বা প্রচারণায় নয়—মানুষ তাঁর দপ্তরে গিয়ে কী ধরনের আচরণ পাচ্ছেন, সমস্যার কতটা সমাধান হচ্ছে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে—তার ওপরই নির্ভর করে।

হাজীগঞ্জের ইউএনওর কক্ষের দরজায় তাই শুধু একটি নির্দেশনা লেখা নেই। সেখানে যেন একটি প্রশাসনিক দর্শনও লেখা আছে—

সরকারি অফিসে আসা মানুষটি ‘সেবাপ্রার্থী’; তিনি অনাহূত নন।

আর সেই কারণেই হয়তো দরজায় লেখা—‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করুন।’