জমি দখলে রাজারবাগ পীরের কেরামতি দেখে হাই কোর্টের বিস্ময়

রাজধানীর শান্তিবাগের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় ৪৯টি মামলার নেপথ্যে এক পীর ও তার অনুসারীদের জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ সংবলিত সিআইডির প্রতিবেদন দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছে হাই কোর্ট। এসব মামলার পেছনে রাজারবাগের পীর দিল্লুর রহমানের সম্পৃক্ততা তুলে ধরে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চে প্রতিবেদন গতকাল দাখিল করে সিআইডি। ওই প্রতিবেদন দেখে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, ‘বাংলাদেশে পীর সাহেবের কান্ড দেখেন! জায়গা জমি দখলের জন্য পীর সাহেব কী করেছেন দেখেন! সম্পত্তির জন্য তথাকথিত মুরিদ দিয়ে মামলা করিয়েছেন। পীর সাহেবের কেরামতি দেখেন!’

আদালতে রিটকারী কাঞ্চনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী এমাদুল হক বশির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার। আর মামলাকারী আফজাল হোসেনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মো. অজিউল্লাহ। ঢাকার শান্তিবাগ এলাকার বাসিন্দা একরামুল আহসান কাঞ্চনের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, অ্যাসিড নিক্ষেপ, চুরি-ডাকাতি, মানব পাচারের মতো নানা অভিযোগে ৪৯টি মামলা হয়। মারামারির এক মামলায় ২০১৩ সালের ১৮ আগস্ট সূত্রাপুর থানা পুলিশ একরামুল আহসান কাঞ্চনকে গ্রেফতার করে। এরপর দুই বছর তিন মাস তিনি কারাগারে ছিলেন। এর মধ্যে ১৭টি মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। ২০১৫ সালের ২১ মে জামিনে বেরিয়ে আসেন কাঞ্চন। পরে আরও বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তিনি জামিনে বের হয়ে আসেন। গত বছর অক্টোবরে নারায়ণগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ আদালতে কাঞ্চনের বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগে ৪৯তম মামলাটি করা হয়।

এ অবস্থায় ‘অস্তিত্বহীন’ বাদীর ২০টি মামলা চ্যালেঞ্জ করে গত ৭ জুন হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন ৫৫ বছর বয়সী কাঞ্চন। সেসব মামলার বাদীকে খুঁজে বের করতে তদন্তের নির্দেশনা চাওয়া হয় রিটে। গত ১৪ জুন প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাই কোর্ট পাঁচ দফা নির্দেশনাসহ রুল দেয়। আবেদনকারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক’ ফৌজদারি মামলা দায়েরে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না- তা জানতে চাওয়া হয় রুলে। এ ছাড়া একরামুল আহসান কাঞ্চনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ‘হয়রানিমূলক’ মামলা দায়েরের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয় আদালত। আদেশ পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শককে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একরামুল আহসান কাঞ্চনের তিন ভাই এক বোন। তাদের বাবা চিকিৎসক আনোয়ারুল্লাহ ১৯৯৫ সালে মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর কাঞ্চনের বড় ভাই আক্তর-ই-কামাল, মা কোমরের নেহার ও বোন ফাতেমা আক্তার রাজারবাগের পীর দিল্লুর রহমানের মুরিদ হন। কিন্তু একরামুল আহসান কাঞ্চন ও তার আরেক ভাই কামরুল আহসান বাদলকে বিভিন্ন সময় প্ররোচিত করেও মুরিদ করা যায়নি।

রাজারবাগ দরবার শরিফের পেছনেই ৩ শতাংশ জমির ওপর তিন তলা পৈতৃক বাড়ি কাঞ্চনদের। পীর দিল্লুর রহমানের মুরিদ হওয়ার পর কাঞ্চনের মা, ভাই-বোনের কাছ থেকে তাদের পৈতৃক জমির বেশির ভাগ অংশ পীরের দরবার শরিফের নামে হস্তান্তর করা হয়। কাঞ্চন ও বাদলের অংশও দরবার শরিফের নামে হস্তান্তর করার জন্য পীর দিল্লুর ও তার অনুসারীরা বিভিন্ন ভাবে চাপ দেন। কিন্তু কাঞ্চন ও তার ভাই সম্পত্তি হস্তান্তর না করায় পীর দিল্লুর রহমান ও তার অনুসারীরা ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় ‘হয়রানিমূলক’ মামলা দায়ের করেন। সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলাগুলোর নথি পর্যালোচনা এবং বাদী ও ভিকটিমদের সম্পর্কে প্রকাশ্য ও গোপনে অনুসন্ধান করে জানা যায় যে, অধিকাংশ মামলার বাদী, সাক্ষী, ভিকটিম কোনো না কোনোভাবে রাজারবাগ দরবার শরিফ এবং ওই দরবার শরিফের পীরের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

Sharing is caring!