ইসরায়েলের তৈরি হ্যাকিং সফটওয়্যার পেগাসাস ব্যবহার করছে বিশ্বের কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো। যার মাধ্যমে তারা আড়িপাতে নিজ দেশের মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবী, রাজনীতিকদের ফোনে। রোববার ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানসহ ১৬টি সংবাদপত্র ইসরায়েলের এই ভয়ঙ্কর হ্যাকিংয়ের ঘটনাটি ফাঁস করে। যাতে বলা হয়, কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো এই হ্যাকিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ডিজিটালি হ্যাক করছে। এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্যগুলো সরকারগুলো ব্যবহার করছে নিজেদের সুবিধার্থে।

হ্যাকিং সফটওয়্যার পেগাসাস ব্যবহার করা দেশগুলো হলো, আজারবাইজান, বাহরাইন, হাঙ্গেরি, ভারত, কাজাখস্তান, মেক্সিকো, মরোক্কো, রুয়ান্ডা, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাইবার সিকিউরিটি ল্যাব পরিচালনাকারী ক্লডিও গুয়ারনিয়েরি বরাত দিয়ে গার্ডিয়ান জানায়, যদি কোনো স্মার্টফোনে পেগাসাস সফটওয়্যারটি প্রবেশ করানো যায়, তবে এনএসওর গ্রাহক পুরো ফোনটির দখল পেয়ে যায়।

এতে ফোনের মালিকের মেসেজ, কল, ছবি, ইমেইল সবই দেখতে পাবে। পড়তে পারে হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, সিগন্যালের বার্তাগুলো। এমনকি গোপনে ক্যামেরা কিংবা মাইক্রোফোন চালুও করতে পারবে এ পেগাসাস সফটওয়্যার।

গার্ডিয়ান জানিয়েছে, সম্প্রতি ফাঁস হওয়া ডেটাবেইসে ৫০ হাজারের বেশি ফোন নম্বর পাওয়া গেছে। ২০১৬ সাল থেকে ইসরায়েল কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোকে এ সেবা দিয়ে আসছে।

এছাড়া এ হ্যাকের কবলে পড়েছে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কর্মীরা। যার মধ্যে রয়েছে এএফপি, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, আল জাজিরা, দ্য ইকোনোমিস্ট, ভয়েজ অব আমেরিকা ও দ্য গার্ডিয়ানের সাংবাদিকরা।

অ্যামনেস্টির সিকিউরিটি ল্যাবের ফরেনসিক বিশ্লেষণ বলছে, সৌদি আরবের কলাম লেখক জামাল খাসোগির দুই নারী বন্ধুকেও প্যাগাসাস স্পাইওয়্যার দ্বারা হ্যাক করা হয়েছে। এছাড়া জামাল খাসোগি হত্যার পর তার বাগদত্তা হাতিস কেনজিজর ফোনেও প্রবেশ করানো হয় হ্যাকিং ম্যালওয়্যারটি।

এদিকে আড়িপাতার দেশগুলোর তালিকায় ভারতের নাম আসায় দেশটিতে শুরু হয়েছে বিস্তার আলোচনা। একটি সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বহু ভারতীয় ফোন থেকে তথ্য চুরির জন্য পেগাসাস ব্যবহার করা হয়েছিল। তালিকায় রয়েছে সাংবাদিক, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা, সমাজকর্মীরাও। ২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত এই সফ্টওয়্যার বিক্রি সীমাবদ্ধ ছিল। এনএসও গ্রুপের ওয়েব সাইটে বলা হয়েছে সংস্থাটি এমন একটি সফ্টওয়্যার বানিয়েছে সেটি সরকারি সংস্থাকে সন্ত্রাসবাদ, অপরধার প্রতিহত করতে সাহায্য করবে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে নরেন্দ্র মোদি সরকার।

পেগাসাস কী

ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান এনএসও গ্রুপ পেগাসাস নামে এই স্পাইওয়্যার সফটওয়্যার তৈরি করেছে, যা আইফোন কিংবা অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ঢুকে ব্যবহারকারীর মেসেজ, ছবি, ইমেইল পাচার করতে যেমন সক্ষম, তেমনি কল রেকর্ড এবং গোপনে মাইক্রোফোন চালুও রাখতে পারে।

২০১৬ সালে এনএসও গ্রুপ এই সফটওয়্যার প্রথম প্রস্তুত করে, তবে তখন তার নাম ছিল কিউ সুইট, পরে তা পরিবর্তন করে নাম দেওয়া হয় ট্রাইডেন্ট এবং তারও পরে নামকরণ হয় পেগাসাস।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাইবার সিকিউরিটি ল্যাব পরিচালনাকারী ক্লডিও গুয়ারনিয়েরি গার্ডিয়ানকে বলেন, “যদি কোনো ফোনে (স্মার্টফোন) পেগাসাস সফটঅয়্যারটি ঢোকানো যায়, তবে এনএসওর গ্রাহক পুরো ফোনটির দখলই পেয়ে যাবে।

‘ফোনের মালিকের মেসেজ, কল, ছবি, ইমেইল সবই দেখতে পাবে, এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, সিগন্যালের বার্তাগুলোও পড়তে পারবে। গোপনে ক্যামেরা কিংবা মাইক্রোফোন চালুও করতে পারবে।”

২০১৯ সাল থেকে সীমিত পরিসরে এই সফটওয়্যার বিক্রি শুরু করে এনওএস গ্রুপ। প্রাথমিক অবস্থায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোই ছিল এর প্রধান ক্রেতা। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার বৈধ লাইসেন্সের মাধ্যমে ‘পেগাসাস’ ব্যবহার করছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, বর্তমান বিশ্বে অত্যাধুনিক স্পাইওয়্যার সফটওয়্যারগুলোর মধ্যে পেগাসাসকে সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে করা হয়।

পেগাসাস প্রজেক্ট

গার্ডিয়ান তার প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ফাঁস হওয়া ডেটাবেইসে ৫০ হাজারের বেশি ফোন নম্বর পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০১৬ সাল থেকে এনএসওর গ্রাহকরা এদের বিষয়ে তৎপর ছিল এবং ‘পেগাসাস প্রজেক্ট’ দৃঢ়ভাবে মনে করে যে এনএসওর গ্রাহক সরকারগুলোর লক্ষ্যবস্তু ছিল ওই নম্বরগুলো।

এই নম্বরগুলোর কিছু ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষায় অর্ধেকের বেশিগুলোতে পেগাসাস সফটওয়্যারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে গার্ডিয়ান জানিয়েছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে নজরদারির মুখে থাকা এই ব্যক্তিদের মধ্যে কারা কারা রয়েছে, তাদের নাম অচিরেই প্রকাশ করবে ‘পেগাসাস প্রজেক্ট’।

এই ব্যক্তিদের মধ্যে সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, বিরোধী রাজনীতিক ছাড়াও ব্যবসায়ী, ধর্মীয় নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, এমনকি মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীর ফোন নম্বরও রয়েছে।

কোনো কোনো রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনের ফোন নম্বরও থাকার কথা জানিয়ে গার্ডিয়ান লিখেছে, ক্ষমতাবান ওই তার স্বজনদের উপরও গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

রোববার এই তালিকা প্রকাশ শুরুর পর ১৮০ জন সাংবাদিকের ফোন নম্বর পাওয়া গেছে, তার মধ্যে সিএনএন, রয়টার্স, নিউ ইয়রক টাইমস, এপি, ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের সাংবাদিক রয়েছে।

৪৫টি দেশের ফোন নম্বর পাওয়া গেছে ওই তালিকায়, তার মধ্যে ১ হাজারের বেশি নম্বর ইউরোপের দেশসমূহের।

পেগাসাসের ক্রেতা কারা?

কোন কোন দেশের সরকার পেগাসাস কিনেছে, গোপনীয়তার শর্তের অজুহাতে সে তথ্য এনএসও প্রকাশ করেনি। তবে সিটিজেন ল্যাবের গবেষণায় অন্তত ৪৫টি দেশে পেগাসাসাস ছড়ানোর প্রমাণ মিলেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট।

দেশগুলো হল: আলজেরিয়া, বাহরাইন, বাংলাদেশ, ব্রাজিল, কানাডা, মিশর, ফ্রান্স, গ্রিস, ভারত, ইরাক, ইসরায়েল, আইভরি কোস্ট, জর্ডান, কাজাখস্তান, কেনিয়া, কুয়েত, কিরগিজস্তান, লাটভিয়া, লেবানন, লিবিয়া, মেক্সিকো, মরক্কো, নেদারল্যান্ডস, ওমান, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন অঞ্চল, পোল্যান্ড, কাতার, রুয়ান্ডা, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড, তাজিকিস্তান, থাইল্যান্ড, টোগো, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উগান্ডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, উজবেকিস্তান, ইয়েমেন ও জাম্বিয়া।

দ্য অয়্যার জানিয়েছে, ভারতের ৩০০টি নম্বরের মধ্যে ৪০ জন সাংবাদিক, বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় তিন নেতা, এক বিচারপতি, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সংস্থার সাবেক ও বর্তমান ব্যক্তিদের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদী সরকারের দুই মন্ত্রীর নম্বরও রয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণ করে অয়্যার জানিয়েছে, এই নম্বরগুলো ২০১৮ ও ২০১৯ সালে আড়িপাতার লক্ষ্যবস্তু ছিল। ২০১৯ সালেই ভারতে লোকসভা নির্বাচন হয়েছিল।

পেগাসাস কেলেঙ্কারি নিয়ে শোরগোল ওঠায় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতির খবর এসেছে টাইমস অব ইন্ডিয়ায়।

তাতে দেশে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন থাকার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমে যে ধরনের খবর এসেছে, তা ভিত্তিহীন। নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ফোনে আড়িপাতার যে অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে করা হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই।

বেআইনিভাবে কোনো ফোনে আড়ি পাতা হয় না দাবি করে ভারত সরকার বলেছে, দেশের স্বার্থে যদি সরকারি কোনো সংস্থার আড়ি পাততেই হয়, তবে তারও সুস্পষ্ট নিয়ম রয়েছে, যা অনুসরণ করা হয়।

দ্য অয়্যার বলেছে, আড়ি পাতার অভিযোগ অস্বীকার করলেও ইসরাইলি পেগাসাস সফটওয়্যার কেনার বিষয়টি সরাসরি নাকচ করেনি ভারত সরকার।

এনএসওর সাফাই

এদিকে, ফোনে আড়ি পাতার এই ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর থেকে বিশ্বের সংবাদমাধ্যমসমূহে এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলেও এক বিবৃতিতে এনএসও জানিয়েছে, পেগাসাস ব্যবহার করে আইনবহির্ভূত নজরদারির যে অভিযোগ উঠেছে তা অনুমাননির্ভর ও ভিত্তিহীন এবং এনএসও কোনো ‘অন্যায়’ কাজের সঙ্গে যুক্ত নয়।

বিবৃতিতে এনএসও কর্তপক্ষ বলেছে, অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ডে নজরদারির জন্যই এটি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে কোম্পানির কাছে তথ্য রয়েছে এবং যেসব দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নত ও সন্তোষজনক, সেসব দেশের সেনাবাহিনী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ পেগাসাস ব্যবহার করে।

কোম্পানির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কোনো দেশের কাছে সফটঅয়্যারটি বিক্রির আগে সে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়।

‘এনএসও কোন দেশের কাছে নজরদারির কী সরঞ্জাম বিক্রি করছে, তার উপর নজর থাকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পরই কেবল তা বিক্রি করা যায়।’- বিবৃতিতে বলেছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।

Sharing is caring!