পোষা পাখির মধ্যে অন্যতম কবুতর। চাঁদপুর জেলায় কবুতর পালনের লোকজনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। জেলার ২৩টি সাপ্তাহিক বাজারে কমপে ৪ হাজার ৬শ’ জোড়া বিভিন্ন প্রজাতির কবুতর বিক্রি হয়। প্রতি জোড়া গড়ে ৮শ’ টাকা। যার বিক্রি মূল্য দাঁড়ায় আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি ৬৮লাখ টাকা। বেশীরভাগ লোকজন সখেই কবুতর পালন করেন। কিন্তু এখন অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে পালন শুরু করছেন। তবে বিকল্প আয়ের উৎসাহ হিসেবে যারা কবুতর পালন করেন তারা বাজারে না এনে অনেকেই সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে তাদের কবুতর বিক্রি করেন। এসব কবুতরের মধ্যে দেশীয় প্রজাতির কবুতরই বেশী।

জেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে, খোঁজ নিয়ে, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সাথে আলাপ করে জানাগেছে, চাঁদপুরে দেশীয় প্রজাতির কবুতর বেশী বিক্রি হয়। দেশীয় কমপে ৩০ প্রজাতির মধ্যে চাঁদপুরে গিরিবাজ, সিরাজী, ফেন্সি, রেছার, লা, জালালি ইত্যাদি কবুতর বেশী পালন করা হয়। তবে সখে অনেকেই প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশ থেকে আনা লাখ টাকা মূল্যের কবুতরও পালন করছেন।

চাঁদপুর জেলায় কবুতর বাজারগুলোর মধ্যে কচুয়া উপজেলায় কচুয়া বাজার, সাচার, রহিমানগর ও রঘুনাথপুর বাজার। শাহরাস্তি উপজেলায় ওয়ারুক ও ঠাকুর বাজার। হাজীগঞ্জ উপজেলায় বাকিলা, হাজীগঞ্জ কাঠ বাজার, রাজারগাঁও ও রঘুনথাপুর বাজার। মতলব উত্তর উপজেলা সুজাতপুর, চেঙ্গারচর ও আনন্দ বাজার। মতলব দনি উপজেলা সদরের দুধ বাজার, নারায়পনুপুর ও মুন্সিরহাট বাজার। চাঁদপুর সদর উপজেলায় বাবুরহাট, মহামায়া ও চান্দ্রা বাজার। ফরিদগঞ্জ উপজেলার ফরিদগঞ্জ সদর বাজার, চান্দ্রা বাজার, রূপসা বাজার, রামপুর বাজার। হাইমচর উপজেলার আলগী বাজার।

বৃহস্পতিবার (৩ জুন) সকালে জেলার সবচাইতে বড় কবুতরের হাট ‘বাবুরহাট’ ঘুরে দেখাগেছে কমপে দেড় শতাধিক কবুতর বিক্রেতা। সাপ্তাহিক নির্দিষ্ট হাটের দিন হওয়ার কারণে লোকজন কবুতর বিক্রি করতে নিয়ে আসেন এই বাজারে। একই হাটে বিক্রি হয় হাঁস ও মুরগী। রোববার ও বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক হাটের দিন। সকাল ১০টা থেকে শুরু করে ২টার মধ্যে বাজারের বিক্রি শেষ হয়ে যায়। জেলা সদর ও আশপাশের উপজেলা থেকে সাধারণ মানুষ ও পাইকারী বিক্রেতারা নিয়ে আসেন কবুতর।

সম্প্রতি হাজীগঞ্জ কবুতর বাজার ঘুরে দেখাগেছে প্রায় ৪০জন বিভিন্ন বয়সী মানুষ কবুতর বিক্রি করতে নিয়ে এসেছেন। এদের মধ্যে কবতুর বিক্রি করতে নিয়ে আসা রাসেল বাংলানিউজকে বলেন, তিনি ৩ জোড়া দেশীয় জাতের কবুতর বিক্রি করতে নিয়ে এসেছেন। দাম প্রতি জোড়া সাড়ে ৫শ’ থেকে ১হাজার টাকা।

ফরিদগঞ্জ উপজেলার চান্দ্রা বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. বারাকাত উল্যাহ পাটওয়ারী দীর্ঘ ২৫ বছর বছর সখে কবুতর পালন করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে তার প্রায় ৩৫ জোড়া কবুতর আছে। অনেক সময় আরো বেশী থাকে। স্কুল জীবন থেকে তার এই কবুতর পালন করার সখ। কখনও বাণিজ্যিক চিন্তা করেন না। সখের কারণেই লালন পালন করা।

তিনি আরো বলেন, চাঁদপুরে এখন বাজারের পাশাপাশি সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমেও অনেক কবুতর বিক্রি হয়। কবতুরের অলনাইন মার্কেট শাক্তিশালী হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে তরুণরাই বেশী কবুতর পালনে বেশী যুক্ত হচ্ছে।

হাইমচর উপজেলার মহজমপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. মহসিন মিয়া বলেন, তিনি বর্তমানে ৭ জোড়া কবুতর পালন করেন। যেগুলো প্রতি জোড়ার মূল্য ১হাজার ৫শ’ থেকে ২ হাজার ২শ’ টাকা। তবে গত কয়েকমাস আগে অজ্ঞাত রোগে তার বেশ কয়েক জোড়া কবুতর মারা যায়।

তিনি আরো বলেন, হাইমচর উপজেলায় প্রতি শনিবার আলগী বাজারে কবুতরের হাট মিলে। শত শত লোক বাজারে কবুতর বিক্রি করতে নিয়ে আসে। কেউ বাচ্চা বিক্রি করে, আবার অনেকে বড় সাইজের কবুতর বিক্রি করেন।

হাজীগঞ্জ উপজেলার বাকিলা ইউনিয়নের বাসিন্দা কামরুজ্জামান টুটুল বলেন, উপজেলার রাজারগাঁও, হাজীগঞ্জ সদর ও বাকিলা বাজারে বেশী কবুতর বিক্রি হয়। প্রতি বাজারে কমপে শতাধিক লোক কবুতর বিক্রি করতে নিয়ে আসেন। এসব বাজার সপ্তাহে দুইদিন বসে। একেক বাজারে একজন বিক্রেতা ২ জোড়া বিক্রি করলে সপ্তাহে ৪শ’ জোড়া কবুতর বিক্রি হয়। তবে কম বেশী হতে পারে।

মতলব উত্তর উপজেলার সুজাতপুর এলাকার বাসিন্দা আরাফাত আল-আমিন বলেন, মতলব উত্তরে চেঙ্গারচর, সুজাতপুর ও আনন্দ বাজারে বেশী কবুতর বিক্রি হয়। একেক হাটের দিন কমপে ১শ’ থেকে ২শ’ জন কবুতর বিক্রি করতে নিয়ে আসে। কবুতরের বাজার এখন অনেকটা চাঙ্গা।

হাজীগঞ্জ উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ জুলফিকার বলেন, চাঁদপুরে অধিকাংশ মানুষ সখে অর্থাৎ সৌখিনতা করে কবুতর পালে। আবার অনেকের ১শ’ থেকে দেড় শ’ জোড়া কবতুর আছে। যারা বেশী পালন করেন তারা খামারির মধ্যে পড়েন। নির্দিষ্ট সময় ভ্যাকসিন দিলে কবুতরের রোগবালাই কম হয়। আমাদের কাছে আসলে পরামর্শ দেই। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে অনেকেই আমাদের কাছ থেকে ভ্যাকসিন ক্রয় করে নেন।

চাঁদপুর জেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মো. বখতিয়ার উদ্দিন বলেন, চাঁদপুর জেলায় কবুতর পালনকারী লোকজনের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। আমাদের উপজেলা হাসপাতালগুলো নিয়মিত চিকিৎসা দিচ্ছে। আবার অনেকেই আমাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোনে কবুতরের চিকিৎসা পরামর্শ নিচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে মাত্র ১৫ টাকায় ভ্যাকসিন পাওয়া যায়। তবে এখন পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে কবুতর খামারীদের নির্দিষ্ট কোন তালিকা করা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

Sharing is caring!