আজ মানিকদার ১০০বছর। আমার সামনে খোলা এক চিঠি। জানি না ওঁর জন্মদিনে এই চিঠি নিয়েই কেন বসলাম?

‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’ ছবির নামাঙ্কিত একটা কাগজ। নীল হরফে লেখা শব্দেরা। এই চিঠিতেই মানিকদা আমায় পত্রবন্ধু বলে মেনে নিয়েছিলেন। মজা করে লিখেছিলেন, “এবার কিন্তু ছবি পাঠাতেই হবে, না হলে কদিন পরে মনে হবে ‘ছায়ার সঙ্গে পত্রালাপে হস্তে হল ব্যথা’। ছবি না পাঠালে কিন্তু বলতে হবে চিঠি লেখা বন্ধ। ”
আর এই চিঠি থেকেই বদলে গেল সম্বোধন। এত দিন লিখতেন, ‘স্নেহের দেবযানী’। এই চিঠি থেকে তা হল, ‘ভাই দেবযানী’। আজও এই খোলা চিঠিতে ওঁর স্বর, অক্ষর, স্পর্শ সব যেন জেগে আছে।

১৯৭৪ সালে আমি তখন নবম শ্রেণীতে পড়ি। সে বছর ডিসেম্বর মাসে মুক্তি পেল ‘সোনার কেল্লা’। ছবি দেখে মোহিত হয়ে গিয়ে মনে হল এ ছবির পারিচালককে একটা চিঠি লিখলে কেমন হয়! সন্দেশের সম্পাদক মশাইকে এর আগে অনেকবার চিঠি দিয়েছি কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে চিঠি লেখা এই প্রথম! তখন এমনটা হয়েই থাকত। লেখকরা তাঁর ভক্তের কাছ থেকে চিঠি পেতেন। এই সব চিঠিরা পরবর্তীকালে আলোতে জায়গা না পেলেও সময়ের অনেকখানিকে যে ধরে রাখত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যাই হোক, চিঠিতে সোনার কেল্লা দেখে মুগ্ধতার কথা তো ছিলই, তা ছাড়া সন্দেশ পত্রিকা সম্বন্ধেও নানা মতামত জানিয়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে কি, তারপর ভুলেই গিয়েছিলাম এ চিঠি লেখার কথা। ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসের সন্ধেবেলা বাবা আমার হাতে একটা এয়ারলেটার দিলেন হাতের লেখা দেখে মুখের কথা আর সরে না! সত্যজিৎ রায় আমার চিঠির উত্তর দিয়েছেন!

সেই শুরু। তারপর চিঠির আদানপ্রদান চলেছিল একটানা ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। এই যে দুজনের চিঠি বিনিময়, এটা আমার জীবন ঘিরে থাকা সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ঘটনা। ১৬ বছর ধরে দুজন দুজনকে চিঠি লিখেছি। মনে হত ওঁর সঙ্গেই পথ চলেছি। চিঠিগুলোই আমাদের মনের কথা বলেছে। ‘আমাদের’ বলে যদিও কিছু লেখা যায় না। যেতে পারে না। বরং অমন আলোকিত মনের সহজ কঠিন জীবনকথা ধরা আছে চিঠিতে এমন বলাই সঙ্গত। আমি তো ওঁকে লিখতাম, কিন্তু সে চিঠি কখন যে অন্যমনে হারিয়ে গেছে, জানি না।