অনলাইন ডেস্ক:

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে বাংলাদেশ এখন সমৃদ্ধির পথে। বিগত ১২ বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। আমরা ২০৩১ সালের মধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা’ অর্জন করতে চাই, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে চাই। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসাবে গড়ে তুলতে চাই।

শুক্রবার বিকালে রাজধানীর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ১০ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার শেষদিনের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া গড়ে তুলতে ভারতসহ এই অঞ্চলের নেতৃবৃন্দকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের এই শুভ মুহূর্তে আসুন প্রতিজ্ঞা করি- সব ভেদাভেদ ভুলে আমরা আমাদের জনগণের মঙ্গলের জন্য কাজ করব। দক্ষিণ এশিয়াকে উন্নত-সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করব।

জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত ‘মুজিব চিরন্তন’ অনুষ্ঠানমালার শেষদিনের মূল থিম ছিল- ‘স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা’। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সভাপতি ছিলেন শেখ হাসিনা। সম্মানিত অতিথি ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

আলোচনা অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। এছাড়া সম্মানিত অতিথি হিসাবে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান ভিডিওবার্তায় শুভেচ্ছা জানান।

এদিকে অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে তার দুই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার হাতে ‘গান্ধী শান্তি পুরস্কার-২০২০’ তুলে দেন। ভারত সরকার বঙ্গবন্ধুকে মরণোত্তর ‘গান্ধী শান্তি পুরস্কার-২০২০’ পুরস্কারে ভূষিত করে।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আজ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। ৫০ বছর আগে এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি জান্তাদের হাতে বন্দি হওয়ার আগ মুহূর্তে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আঞ্চলিক সহযোগিতায় বিশ্বাসী ছিলেন। বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি তিনি স্বপ্ন দেখতেন অর্থনৈতিক মুক্তির। এজন্য পারস্পরিক বিশ্বাস, আস্থা এবং সমতার ভিত্তিতে সহযোগিতার ওপর তিনি জোর দিতেন। ভারত দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ দেশ। একটি স্থিতিশীল এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দক্ষিণ এশিয়া গড়ে তুলতে হলে ভারতকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা যদি পরস্পরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসি, তাহলে আমাদের জনগণের উন্নয়ন অবশ্যম্ভাবী।

তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। কিন্তু এখানে অনেক সম্পদ রয়েছে। এ সম্পদের সঠিক ব্যবহার করতে পারলে এই অঞ্চলকে ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত এবং সমৃদ্ধিশালী অঞ্চল হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদি যোগদান করায় তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারত সরকারের অবদানের কথাও তিনি উল্লে­খ করেন।

তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মানিত অতিথি হিসাবে উপস্থিত হয়ে আমাদের আয়োজনকে মহিমান্বিত করেছেন। বাংলাদেশের সরকার, জনগণ, আমার ছোট বোন শেখ রেহানা এবং আমার নিজের পক্ষ থেকে ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এবং সেদেশের জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। ভারত সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি এই শুভ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মর্যাদাশীল ‘গান্ধী শান্তি পুরস্কার-২০২০’-এ ভূষিত করার জন্য। আমি মনে করি, তাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করার মাধ্যমে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার একজন যোগ্য নেতা এবং গান্ধীজির প্রকৃত অনুসারীকেই সম্মানিত করল। একই সঙ্গে ভারত সরকার বাংলাদেশের জনগণের জন্য ১০৯টি অ্যাম্বুলেন্স উপহার দিচ্ছে। ভারতের জনগণ সব সময় দলমতনির্বিশেষ বাংলাদেশের পাশে থাকে বলেও প্রধানমন্ত্রী উলে­খ করেন।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ভারত শুধু আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্রই নয়, ভারতের সঙ্গে আমাদের রয়েছে ঐতিহাসিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যগত এবং ভৌগোলিক সেতুবন্ধ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে ভারতের সরকার এবং সেদেশের জনগণ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাচারের মুখে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রায় ১ কোটি শরণার্থীকে ভারত আশ্রয় দিয়েছিল। খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসাসেবা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে সহায়তা করেছিল। বাংলাদেশ-ভারত মিত্রবাহিনীর যৌথ অভিযানের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। এই যুদ্ধে ভারতের উলে­খযোগ্য সংখ্যক সৈন্য শহিদ হয়েছেন। আমি তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের জনগণের যে আত্মত্যাগ, সাহায্য-সহযোগিতা, তা কখনও ভুলবার নয়। আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে সে অবদানের কথা স্মরণ করি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে যেসব বন্ধুরাষ্ট্র এবং মানুষ অবদান রেখেছিলেন, তাদের সম্মাননা জানিয়েছেন উল্লে­খ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে স্বাধীনতা সম্মাননা, সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়ীকে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননাসহ ২২৫ জন ভারতীয় নাগরিককে আমরা মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননায় ভূষিত করেছি।

অনুষ্ঠানের সম্মানিত অতিথি নরেন্দ্র মোদির নীতির প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের সঙ্গে বর্তমানে আমাদের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। আমরা প্রধানমন্ত্রী মোদিজির ‘প্রতিবেশী সর্বাগ্রে’ নীতির প্রশংসা করি। বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোয় করোনাভাইরাসের টিকা পাঠানোর মাধ্যমে মোদিজির এই নীতিরই প্রতিফলন ঘটেছে। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে ব্যবসায়-বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত আমাদের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য সম্প্রতি ফেনী নদীর ওপর মৈত্রী সেতুর উদ্বোধন করা হয়েছে। এই রাজ্যগুলো এখন চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বাংলাদেশ-ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উপলক্ষে উভয় দেশ বেশকিছু যৌথ কর্মসূচি পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া এ উপমহাদেশের দুই বরণীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে ভারত সরকার বঙ্গবন্ধু-বাপু ডিজিটাল প্রদর্শনীর উদ্যোগ নিয়েছে। আমি এজন্য ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

আলোচনা অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী বাঙালির কাছে নিছক জন্মদিন পালন নয়, বাঙালির কাছে মুক্তিদাতার প্রতি সম্মান জানানোর বিরল সুযোগের দিন। সেই সঙ্গে যে জাতিকে তিনি মুক্তি দিয়েছেন, অবয়ব দিয়েছেন, তার প্রতি সম্মিলিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সময়ও এটি। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ১০ দিনব্যাপী এই আয়োজন আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

Sharing is caring!