উপাচার্যের পদ শূণ্য দেশের পাঁচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এগুলোর চারটিতে পূর্ণকালীন উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত দিয়ে কাজ চলছে। কোথাও পরবর্তী সিনিয়র কর্মকর্তা কিংবা সিনিয়র ডিন বা অধ্যাপক ভারপ্রাপ্ত হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি একটি হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এখন পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় চলতি মাসে শূন্য হবে আরও দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ। সব মিলে জুনের মধ্যে ডজনখানেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দিতে হবে নতুন উপাচার্য।

এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে কে দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা জানার আগ্রহ আছে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে। বিপরীতে নিয়োগ পেতে সরকারপন্থি বেশকিছু অধ্যাপক লবিং-তদবির করছেন। তাদের কেউ স্থানীয় রাজনৈতিক আবার কেউ জাতীয় নেতাদের মাধ্যমে নিজের নামটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত প্যানেলে অন্তর্র্ভুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন কিংবা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের লক্ষ্যে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিনিয়র অধ্যাপকদের ১০ শতাংশকে নিয়ে তালিকা করা আছে। উপাচার্য নিয়োগে সেই তালিকা বিবেচনায় আছে। এর বাইরে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কয়েকজন অধ্যাপক আছেন যারা তদবির না করলেও আলোচনায় আছেন। নিয়োগপ্রত্যাশীদের জীবনবৃত্তান্তও দেখা হচ্ছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন সূত্র জানিয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন যুগান্তরকে বলেন, উপাচার্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী এবং একাডেমিক লিডার। তাই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি একাডেমিক এক্সিলেন্স বিবেচনা করে থাকে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এই পদ শূন্য আছে, সেখানে অচিরেই নিয়োগের কাজ শেষ হবে। এ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রোভিসি ও কোষাধ্যক্ষের শূন্যপদ পূরণে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ শতাংশ সিনিয়র অধ্যাপককে নিয়ে গত বছর একটি পুল গঠন করা হয়েছে। তবে আমি মনে করি, কেবল সিনিয়রিটির ভিত্তিতে উপাচার্যের দায়িত্ব দেওয়া ঠিক নয়। এই পদে দায়িত্ব পালন করতে হলের প্রভোস্ট, ডিন, বিভাগের চেয়ারম্যান ইত্যাদি পদে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। তাছাড়া চিন্তা-চেতনার দিকটিও দেখা হয়। কেননা, ক্যাম্পাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন ধরনের জনবল চালাতে হয়। তাই ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট ক্যাপাবিলিটি’, অতীত রেকর্ড, অভিজ্ঞতা এবং একাডেমিক এক্সিলেন্স বিশেষ করে সততার দিকটি দেখা জরুরি। নইলে বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর পরিবর্তে তারাই দুর্নাম কামাই করবেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়েও অচলাবস্থা তৈরির শঙ্কা থাকে।

উপাচার্যশূন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আছে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এগুলোর মধ্যে প্রথমটি গত ৪ জানুয়ারি, দ্বিতীয়টি ২৯ জানুয়ারি আর তৃতীয়টি ৩১ জানুয়ারি শূন্য হয়। এ তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। বিদায়ি উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ বৃহস্পতিবার শেষ কর্মদিবস কাটান। যদিও এখন পর্যন্ত সেখানে কাউকে ভারপ্রাপ্ত দেওয়া হয়নি। তবে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মশিউর রহমান কাজ চালিয়ে নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরবর্তী উপাচার্য হতে আগ্রহীদের একজন তিনি। মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি সূত্র জানিয়েছে, বেশ কয়েকজনের নাম আলোচিত হচ্ছে। তাদের মধ্যে আছেন-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েরই সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর-এর অধ্যাপক এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এম অহিদুজ্জামানের নামও শোনা যাচ্ছে।

চলতি মাসে খালি হবে আরও দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ। এর মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মীজানুর রহমানের মেয়াদ শেষ হবে ২০ মার্চ। দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার কারণে বর্তমান উপাচার্য বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। কেননা, তিনি প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ দেওয়ার আগে ছাত্র-সংঘাত ও আন্দোলন লেগেই থাকত। তিনি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালনার মাধ্যমে সেশনজট দূর করেছেন। তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান এবং বেশকিছু মানবিক ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক বিভাগ খুলেছেন। অবশ্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দুই দফায় দায়িত্ব পালন করেছেন। একটি সূত্র জানিয়েছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনর্নিয়োগ না দিলেও তাকে আরও উচ্চতর পদে কিংবা বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া হতে পারে। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসাবে যাদের নাম আলোচিত হচ্ছে তাদের একজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এ পদে বিবেচিত হতে পারেন।

আগামী ২৩ মার্চ শূন্য হবে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) উপাচার্যের পদ। একই দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া, ৬ মে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুস সোবহান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গিয়াস উদ্দিন মিয়ার ১০ জুন, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের ১৯ মে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহর ১৩ জুন এবং রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষের ১০ জুন মেয়াদ শেষ হবে। তাদের মধ্যে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন কোভিড মহামারি শুরুর পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবার আগে করোনা পরীক্ষায় এগিয়ে এসে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এ কারণে তিনি সরকারের ‘গুডবুকে’ আছেন বলে জানা গেছে। অনুপস্থিতি এবং নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িত হওয়ার দায়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে মাসখানেক আগে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। এটা সরকারের ‘ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের ইচ্ছা’-এমন কথাও তাকে জানানো হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। আরেক ভিসি মেয়েজামাইকে নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে দুর্নাম কুড়িয়েছেন। অপর এক ভিসি নিজের ছেলেকে নিয়োগ দিতে আইনের সংশোধন করেন। এরপর আবার আগের জায়গায় আইন নিয়ে যান সেই ভিসি। অপর ভিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ, স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের পরিবর্তে ঢাকায় নগর ক্যাম্পাস গড়ায় তার আগ্রহ বেশি। এক্ষেত্রে ওঠা অভিযোগ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। তবু তিনি পুনর্নিয়োগ পেতে তদবির চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

দেশের প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বিএসএমএমইউতে কে হবেন পরবর্তী উপাচার্য, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল চিকিৎসক মনে করছেন, বর্তমান উপাচার্য পুনর্নিয়োগ পেতে পারেন। তবে বেশির ভাগের মত ভিন্ন। তারা বলছেন, উপাচার্য হিসাবে নিয়োগ পেতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে অনেকেই যোগাযোগ করছেন। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর যার ওপর আস্থা রাখবেন, তিনিই উপাচার্য হিসাবে নিয়োগ পাবেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান উপাচার্য ছাড়া আলোচনায় এগিয়ে আছেন সাবেক উপ-উপাচার্য চক্ষুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ। তিনি এর আগে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন-বিএমএ-এর মহাসচিব হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাছাড়া তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ। দ্বিতীয় অবস্থানেই রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সিন্ডিকেট সদস্য নিউরো সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হোসেন। তিনি ছাত্রলীগের কর্মী হিসাবে ছাত্রজীবন থেকেই নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। এমনকি নবম বিসিএসের মাধ্যমে চাকরিজীবন শুরু করলেও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহতদের সেবা দেওয়ার অপরাধে তৎকালীন সরকার তাকে সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি অনিয়মের বিরুদ্ধে তিনি অন্যতম প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসাবে পরিচিত। তাই তিনি দায়িত্ব পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। এছাড়াও আলোচনায় আছেন সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শহিদুল্লাহ শিকদার, বিএমডিসির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. শহিদুল্লা, বর্তমান উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শাহানা রহমান, সার্জারি বিভাগের ডিন জুলফিকার রহমান খান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. আবু নাসার রিজভী, বর্তমান কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. এএসএম আতিকুর রহমান প্রমুখ।

Sharing is caring!