ইনি জাতীয় সম্পদ, আমাদের ইতিহাসের অংশ। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি জাতীয় সংসদে ইনি আমার প্রতিনিধি। অনেক বছর আগে বুলবুলের একরামুল হকের আমন্ত্রণে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেদিন প্রিয় বন্ধুটি আমাকে যেতে অনুরোধ করেছিলো প্রধানত ছবির মানুষটির বক্তব্য শোনার জন্যে। বেশকিছু সুখপাঠ্য এবং মূল্যবান বইয়ের স্বনামধন্য লেখক, সরকারের দায়িত্ব পালন করা যোগ্য প্রশাসক এবং তাঁর প্রধানতম পরিচয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ১নং সেক্টরের সফল কমান্ডার মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম_দেশের কে না চেনে তাঁকে। সামনে পেলাম সেবার প্রথম। সেখানেই বুলবুল বললো, জানিস্ তো, ইনি তোর উপজেলার মানুষ। আমি আঞ্চলিকতা পছন্দ করি না। তবু মুখ দিয়ে বের হয়েছিলো, বাহ্! অনেকদিন পর জানলাম তাঁর বাড়ি আমাদের পাশের গ্রাম নাওড়াতে, কিংবদন্তি ড. সাত্তার, সাত্তার সাবের বাড়ি, দিদির বাড়ির কাছাকাছি। তাঁর চলাচলের রাস্তা আমারও নিত্যদিনের পথ।

কিছুক্ষণ পরপর সামনে রাখা গ্লাস থেকে একটু একটু জল মুখে নিচ্ছিলেন আর দামী ও সুললিত বক্তব্যে মুগ্ধ করছিলেন নীরবতার অলংকারে মোড়া একটা হলরুমের তাবৎ উপস্থিতিকে। সেদিন স্বপ্নেও ভাবিনি তাঁর অভিভাবকত্ব নিয়ে আমি কোথাও কিছু বলবো। বিদায় নেবার আগে বুলবুলকে উষ্ণ একটা ধন্যবাদ দিয়েছিলাম আমাকে এমন দুর্লভ একটা সুযোগ করে দেবার জন্যে।

আমাদের প্রয়াত খালেক চেয়ারম্যান, বাপ-বেটা সকলের প্রিয় খালেক ভাই আমাকে খুব আদর করতেন। কালিয়াপাড়া বাজারে খালের দক্ষিণের দোকানে একদিন বললেন, ‘সমিরন, তোকে একটা সুখবর দিই, রফিক সাহেব এখানকার রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন। আমাদেরকে আর অভিভাবক নিয়ে ভাবতে হবে না!’

খালেক ভাই ছাড়া শাহরাস্তির আর কোনো নেতার সাথে যে তখনও আমার যোগাযোগ পরিচয় নেই, এটা তিনিও জানতেন। প্রশ্ন করেছিলাম, ‘কোন্ রফিক সাহেব খালেক ভাই?’

‘কী বলছিস্, চিনিস্ না উনাকে? মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের…’

আমি উল্লসিত হয়েছিলাম, ‘খালেক ভাই, আমি চট্টগ্রামে উনার বক্তব্য শুনেছি, চিনিতো উনাকে, খুব ভালো খবর দিলেন!’

‘শোন, এলাকায় কখনও রাজনীতি করার ইচ্ছা হলে উনার পাশে নিশ্চিন্তে দাঁড়াতে পারবি। খুব ভালো মানুষ উনি। উনার মতো মানুষের রাজনীতিতে আসাটা এলাকার জন্য জরুরি।’

শেকড়ে জড়িয়ে পড়ার পর আমি আর কোনো কিছুতেই মনোযোগী হইনি, রাজনীতিতেও না, সংসারেও না। তবে সমাজের দিকে চোখ রাখি। শাহরাস্তির গণমানুষের সমাজে আতঙ্ক নেই বললেই চলে। রাজনৈতিক কারণে কম-বেশি যাঁরা ভুগেছেন, তাঁরাও স্বীকার করেন, শাহরাস্তির পরিবেশ ভিন্ন রকম।

এখানে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চেহারা অন্য অঞ্চলের মতো নয়। শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে বিছানা বদলের জীবনযাপন করে কেউ যদি কষ্ট পেয়ে থাকেন, আমাকে ক্ষমা করবেন, সেভাবে আমার জানা নেই। আপনার কষ্টের সমব্যথী হতে পারি, লজ্জিতও হতে পারি। তবু আমার সাদা চোখে আমি দেখি এখানে মাস্তানতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, চাঁদাবাজি হয় না। খোলা অস্ত্র দেখে কারও বুকে হিমশীতল অনুভূতি হয় না।

রাজনীতির প্রচলিত স্রোতের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আমরা একরকম শান্তিতেই আছি। বিজয়ী পক্ষ দম্ভে ফেটে পড়ে না, বিজিত পক্ষ হিংস্র পথে প্রতিবাদের ভাষা খোঁজে না। শাহরাস্তির শান্তি সকলের কাছে একনম্বর অগ্রাধিকার। আমার গর্ব এখানেই। সুদীর্ঘ একটা সময় ধরে একটা জনপদে শান্তির আবহ বজায় রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। এ গৌরব নেতৃত্বের, জনতার, প্রশাসনের_সবার।

এখানে উচ্চপদে সরকারি কর্মকর্তা যাঁরা আসেন, যদ্দুর বুঝি আমাদের অভিভাবকের পছন্দের একটা গুরুত্ব থাকে। এজন্যে ‘সেই ওসি’, ‘সেই ইউএনও’ জাতীয় কর্তামশাই আমাদের দেখতে হয় না শাহরাস্তিতে। বরং সেসব জনবান্ধব কর্মকর্তাদের নিয়মমাফিক বিদায়ের সময়ও এখানে কান্নার রোল ওঠে।

‘আমাদের বর্তমান ওসি সাহেব শাহরাস্তিবাসীর দায়িত্বশীল আত্মীয়’_সমপ্রতি মনবাগানে বসে ছোটভাই এমরান পাটোয়ারী বলেছে এ কথা। আমি ওর সাথে একমত।

আমাদের এমপি মহোদয়ের ওপর শতভাগ মানুষ সন্তুষ্ট কি না আমি এ জরিপ করতে যাবো না, রাজনীতিতে প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি নিয়ে কেউ অসন্তুষ্ট থাকতেও পারেন, তবে এম. এ. মান্নান সাহেবের মতো আত্মীয়সম কর্মকর্তা পাওয়াসহ নাগরিক জীবনের বহু ক্ষেত্রে অনুভব করি, তিনি আমাদের অভিভাবক হিসেবে ব্যর্থ নন। তাঁর পিতৃসম অভিভাবকত্ব বজায় থাকুক, চলতি নির্বাচনেও।

প্রিয় অভিভাবক, আপনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি। আর কামনা করছি আপনার সুবৃহৎ পরিবারে কোনোভাবে রক্ত ঝরবে না, কান্নার রোল উঠবে না রাজনৈতিক কারণে। আপনার বদনাম আমাদেরকে ব্যথিত করবে। যারা কাছে না গিয়েও আপনাকে ভালোবাসি।

Sharing is caring!