মানুষ মরে গেলে পচে যায় কিন্তু স্মৃতির পাতায় থেকে যায়। চাঁদপুর জেলা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি, তৃণমূল সাংবাদিক শাহ্ মোহাম্মদ মাকসুদুল আলম হঠাৎ করেই চলে গেল না-ফেরার দেশে। মাকসুদের ইন্তেকালের খবর পেয়েই স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠল আমার জীবনের দুঃসময়ের অনেক স্মরণীয় ঘটনা। মনে পড়ল মাকসুদ পাঞ্জাবি পরে, হেলমেট মাথায় মোটরসাইকেল নিয়ে আমার সামনে এসে নিজের হেলমেট আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, উঠুন আমার মোটরসাইকেলের পেছনে…।

৪ নভেম্বর, সোমবার, ২০১৩ সাল। চাঁদপুর জেলা জজ আদালতে যে কোনো মূল্যে আমাকে হাজিরা দিতেই হবে। উল্লেখ্য, কচুয়া যুবদলের সহসভাপতি দেলোয়ার হোসেন দুলালের কারান্তরিন অবস্থায় মৃত্যুবরণের প্রতিবাদে কচুয়ায় হরতাল পালিত হয় ১৯ অক্টোবর, ২০১৩ সালে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কচুয়া থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের করা তিনটি মামলারই প্রধান আসামি আমি। হাই কোর্টের দুই সপ্তাহ জামিনের নির্দেশনায় হাজির হতে হবে নিম্ন আদালতে। সুযোগ খুঁজছিলাম আদালতে হাজিরা দেওয়ার। আর মাত্র তিন দিন বাকি।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোল বাজছে। প্রতিপক্ষের ইঙ্গিতে আমাকে গ্রেফতার করতেই হবে। হন্যে হয়ে পুলিশ খুঁজছে আমাকে। আশ্রয় নিলাম হাওরঘেরা মৌলভীবাজারের একটি মৎস্য খামারে। সেখান থেকে বিরোধী জোটের ডাকা ৬০ ঘণ্টার হরতালের মধ্য দিয়েই সন্ধ্যার পর শ্রীমঙ্গল থেকে চাঁদপুরের পথে রওনা দিলাম, রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড, আগুন-ধোঁয়া, কোথাও পুড়ে যাওয়া বাস-ট্রাক। অকল্পনীয় বিপৎসংকুল পথ পেরিয়ে কুমিল্লা হয়ে চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার জগৎপুরের কাছে এসে কল দিলাম মাকসুদকে। ওপাশ থেকে জানাল কঠিন গোয়েন্দা নজরদারির কথা। পাশে বসা দুর্দিনের সাহসী সহায়ক বলল, ফরিদগঞ্জের উপজেলা চেয়ারম্যান হাজী মোজাম্মেলের বাড়িটিই আজ রাতের জন্য নিরাপদ। সারা দিন দোতলার সবুজঘেরা ছোট্ট চিলেকোঠায় বসে মাকসুদের সঙ্গে পরামর্শ করে মধ্যরাতে পুলিশের চোখ এড়িয়ে চাঁদপুর শহরে প্রবেশ করলাম। আবু তাহের মতিন ও মাকসুদ আমাকে গোয়েন্দা চক্ষুর অন্তরালে রেখে আদালতের কাছাকাছি রাতযাপনের ব্যবস্থা করল।

হাজিরার প্রস্তুতি শেষে বন্ধুবর, চাঁদপুরের সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট কামরুল ভাই জানালেন বারের প্রবীণ আইনজীবী কামালউদ্দিন সাহেবের ইন্তেকালের কারণে আজ আদালতের কার্যক্রম বন্ধ। পরদিন হাজিরার শেষ দিন। হাজির হতেই হবে। অ্যাডভোকেট কামরুল ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে মাকসুদ অতি গোপনীয়তার সঙ্গে কোর্ট দারোগাকে ঘুমের মধ্যে রেখে স্বল্প সময়ের ভিতর আদালতে হাজিরা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিল।
…লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখতে মাকসুদ নিজের ধুলোমাখা পাঞ্জাবি খুলে আমাকে পরিয়ে দিল আর ও পরে নিল অন্যের শার্ট। আদালত চত্বরে পৌঁছে হেলমেট মাথায় নিয়েই কাঠগড়ায় দাঁড়ালাম। বিজ্ঞ জজ সাহেব আসামিকে হেলমেট মাথায় কাঠগড়ায় দন্ডায়মান দেখে বিরক্তিতে ভ্রু কোঁচকালেন। হেলমেট সরিয়ে ফেলব, ঠিক ওই সময়ই কৌশলী কামরুল ভাই জোরে জোরে বলতে শুরু করলেন, ‘মাননীয় আদালত! কাঠগড়ায় হাজির হয়েছেন সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মিলন সাহেব। ’ জজ সাহেব জামিন মঞ্জুর করতেই কালক্ষেপণ না করে দৌড়ে বের হয়ে আসি। মাকসুদের মোটরসাইকেলে উঠতেই ফোন এলো আমার স্ত্রী নাজমুন নাহার বেবীর। ততক্ষণে মাকসুদ দিগ্বিদিকহীন, পাছে পুলিশ তাকে আটকে ফেলে। বেবী ফোনে বলছেন, ‘পশ্চিম-উত্তরপূর্বে পুলিশ স্ট্যান্ড টু, তোমার জন্য খোলা পথ শুধু দক্ষিণে’। দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল নিয়ে ছুটছে মাকসুদ। প্রচ- বাতাসে কানে তালা লাগার অবস্থা, তার পরও বেবীর কথা শুনে পথনির্দেশনা দিতে ওকে থামতে বলি।

সে চিৎকার করে বলে, ‘থামানো যাবে না’। সামনে তাকাতেই দেখি, মোটরসাইকেলটি একটি ব্রিজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বুঝলাম, ডাকাতিয়া নদীর ওপরে ফরিদগঞ্জ যাওয়ার বাগাদী ব্রিজ। দীর্ঘশ্বাস ফেললাম কিছুটা প্রশান্তি নিয়ে, তিন দিকের স্ট্যান্ড টুর বাইরে দক্ষিণের রাস্তাটি আমাদের জন্য খোলা, আর মাকসুদ তো সে পথেই যাচ্ছে, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
ব্রিজটির ওপরে উঠছিলাম আর ছাত্রজীবনের মোটরসাইকেল রাইডিংয়ের অনুভূতি নিয়ে প্রকৃতি উপভোগ করছিলাম। মোটরসাইকেলটি যখন সেতুর নিম্নগামী অংশে, দেখলাম সামনে পুলিশের ভ্যান, আঁতকে চিৎকার করে বললাম, মোটরসাইকেল ঘোরাও। দৃঢ় কণ্ঠে প্রচ- আত্মবিশ্বাসী হেলমেটবিহীন মাকসুদ বলল, ‘চাঁদপুরের সব পুলিশই এ মুখটি চেনে। তারা আমাকে থামাবে না’। তীব্র গতিতে রুদ্ধশ্বাসে পুলিশের চেকপোস্ট পেরিয়ে গেল মাকসুদ। শহীদ জিয়ার ধনগোদা বেড়িবাঁধ প্রকল্পের সুফল বয়ে আনা, অসময়ে বন্যায় প্লাবিত সেই ফরিদগঞ্জ আজ সবুজে ভরা। নিভৃত রাস্তার পাশে নীরব পল্লীতে বাইক থামিয়ে কোথায় যাব, আলোচনা করতেই মাকসুদ মনে করিয়ে দিল পাশের ধনুয়া গ্রামের মিজিবাড়িই হচ্ছে প্রফেসর মোশাররফ হোসেন লিটনের। অতি আস্থাভাজন আমার সুপ্রিয় ছোট ভাইয়ের এলাকায় এসে আমিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এতক্ষণে চাঁদপুরের পুলিশ ও প্রশাসন জেনে গেছে মাকসুদের সঙ্গেই আমি আছি। টেলিফোন ট্র্যাকিং হচ্ছে ভেবে লিটনকে না জানিয়েই ওর বাড়িতে হাজির হলাম। সেখান থেকে লিটনের বড় ভাই দেলোয়ার হোসেনের দ্বারা ফোন করে ওকে জানানো হলো।

এরই মধ্যে মুরগির পলো দিয়ে দেশি মুরগি ধরার কক কক শব্দ শুনে বুঝতে পারলাম খাওয়ানোর প্রস্তুতি আর আমি ভাবছি কোন দিকে, কীভাবে কোথায় যাব। ঘন ঘন কল আসছিল মাকসুদের ফোনে, ট্র্যাকিংয়ের কারণে আমি তাকে ফোন তুলতে নিষেধ করলাম, বিষণœœ মনে মাকসুদকে বিদায় দিয়ে আমি একাই রইলাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই হন্তদন্ত হয়ে হাজির হলো লিটন। পড়ন্ত বিকালে দুপুরের খাবার সেরে কালবিলম্ব না করে চাঁদপুর থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। লিটনের মোটরসাইকেলের পেছনে আমি, আর প্রফেসর আবদুল্লাহ আল শাহিন একা আরেকটি মোটরসাইকেলে আমাদের অনুসরণ করতে থাকল। এগিয়ে চলছি রায়পুর হয়ে লক্ষ্মীপুরের দিকে। ইতিমধ্যে আমি লক্ষ্মীপুর বিএনপির প্রবীণ নেতা, জেলা বিএনপি সভাপতি ও কমলনগর উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শামসুল ইসলাম সাহেবের ছেলে জেলা কৃষক দল সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফখরুল আলম নাহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। রায়পুর পার হতেই নাহিদ ও কাজী বেলাল মোটরসাইকেলে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। ৩২ কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছিলাম, সারা পথেই শুধু ব্যারিকেড আর দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। বিরোধী জোটের ৬০ ঘণ্টার হরতালের দ্বিতীয় দিনে মনে হচ্ছিল আমরা আফ্রিকার কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আছি। অ্যাডভোকেট সাহেবের বাসার চেম্বারে ঢুকে সালাম দিতেই তার চক্ষু চড়ক গাছ! তিনি ভুলেই গেলেন তার পাশে রাখা চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে বা আমাকে চা দিয়ে আাপ্যায়ন করতে। নাহিদকে বললেন, মিলন সাহেবের অবস্থান এখানে মোটেই নিরাপদ নয়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় নাহিদ ব্যবস্থা নিল, কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি অ্যাম্বুলেন্সসহ হাজির হলো লক্ষ্মীপুর পৌর যুবদল সভাপতি ইকবাল মাহমুদ জুয়েল। আমাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে হাতে স্যালাইন দিতে উদ্যত হতেই আমি অস্বীকৃতি জানালে জুয়েল নিজেই রোগী বনে যায়। রাতের অন্ধকারে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ লক্ষ্মীপুর ফেনী সড়কে ভোঁ ভোঁ সাইরেন বাজিয়ে চট্টগ্রামে আমার প্রিয় ছোট ভাই শাহ আলমের বাসার উদ্দেশে রওনা দিলাম। পথে বহুবার ব্যারিকেড পড়েছে, এমনকি পুলিশও আটকানোর চেষ্টা করেছিল। জুয়েল হঠাৎ করে বলল, সেই দুপুরে খেয়েছি, রাত গড়িয়ে যাচ্ছে, প্রচ- ক্ষুধা লেগেছে। হরতালে দোকানপাট বন্ধ থাকায় কোনো খাবারের ব্যবস্থা করা যায়নি। অনাহারে, ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত নাহিদ ও জুয়েল আমাকে নিয়ে চিটাগাং শহরে একটি হাসপাতালের সামনে অপেক্ষারত শাহ আলমের প্রাইভেট কারে তুলে দেয়। ভোররাত প্রায় ৪টায় ওদের বিদায় দিলাম। শাহ আলমের বাসায় গিয়ে ফজরের নামাজ পড়ে নাস্তার টেবিলে বসে ভাবছিলাম ক্ষুধার্ত জুয়েল ও নাহিদের কথা। কখন লক্ষ্মীপুরে ফিরবে, কীভাবে ফিরবে, পথে কিছু হলো কিনা! নিরাপদে পৌঁছাল কিনা, কিছু খেল কিনা। এ আফসোসে আমি বিছানায় যেতে পারিনি। নিজের জীবন বাজি রেখে নেতার নিরাপত্তার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিজেকে বিপদগ্রস্ত করা সহজ কথা নয়। বিদায়ের বেলা বেদনার্ত হৃদয়ে বারবার বলছিলাম, পৌঁছেই আমাকে কল করবে।

ফোনকলের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে হঠাৎ কল এলো নাহিদের, কান্নাজড়িত, আড়ষ্ট কণ্ঠে শুধু বলল, ভাই, জুয়েল আর নেই। নিজেকে নিদারুণ অপরাধী মনে হলো, আজ মাকসুদের কথা স্মরণ করতেই আমার স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠল সেদিন যে তিনজনের সাহায্য নিয়েছিলাম, তার মধ্যে ওই দিন হারিয়েছিলাম জুয়েলকে, তারপর না-ফেরার দেশে চলে গেলেন কামরুল ভাই আর এবার হারালাম মাকসুদকে।

মাকসুদ কখনো অর্থনৈতিক সচ্ছলতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করতে পারেনি কিন্তু মিডিয়াকর্মীদের পক্ষেই সব সময় কথা বলত। আমাকে মাঝেমধ্যে উপদেশের সুরে বলত মিডিয়াকর্মীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনের জন্য জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে আপনি যেভাবে সরকারের কোষাগার থেকে খরচ না করে জাটকা নিধনবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, সরকারের অনুদান না নিয়ে যেভাবে নকলবিরোধী আন্দোলন করেছিলেন, আপনি যথার্থই শহীদ জিয়ার অনুসারী। যে কোনো সৎ কাজে অর্থের জোগান সব সময়ই পাওয়া যায়। শহীদ জিয়ার সেই উক্তিটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলল, মানি ইজ নো প্রবলেম। তাই আপনাকে অনুরোধ করব চাঁদপুরের সাংবাদিকদের জন্য এমন একটি পরিকল্পনা করুন। যেখান থেকে সাংবাদিকরা অর্থনৈতিক সাহায্য-সহযোগিতা পাবেন। তবেই তো হলুদ সাংবাদিকতা বন্ধ হবে।

এই তো আসছে মাসে যেতে হবে হাজিরা দিতে, চাঁদপুরের আদালত চত্বরে, বুম হাতে এগিয়ে আসবে সাংবাদিকরা আমার বক্তব্য নিতে, তাদের মধ্যে অবুঝ মন খুঁজে বেড়াবে মাকসুদকে, যেমনিভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অহর্র্নিশ খুঁজে ফিরি কালো গাউন পরা অ্যাডভোকেট কামরুল ভাইকে। মহান আল্লাহ তাদের বেহেশত নসিব করুন।

লেখক : সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি।

(কপি-পেস্ট বাংলাদেশ প্রতিদিন)

Sharing is caring!