একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বেশ কয়েককটি সাংগঠনিক জেলাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ইউনিটে কমিটি দিয়েছে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন। কিন্তু এসব কমিটি গঠন নিয়ে বিএনপির সিনিয়র নেতারা ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে নিজ নির্বাচনী এলাকায় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের মতামত না নেয়ায় স্থায়ী কমিটি ও ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে ক্ষোভের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে।

সম্প্রতি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে প্রস্তাব করা হয়- অন্তত স্থায়ী কমিটির নেতাদের নির্বাচনী এলাকাগুলোতে যেন তাদের মতো করে কমিটিগুলো করা হয়। এছাড়া এ নিয়ে জুলাইয়ে স্থায়ী কমিটির কয়েকজন নেতা অনানুষ্ঠানিক বৈঠকও করেছেন।

সেখানে দল পুনর্গঠনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার ব্যাপারে তারা একমত পোষণ করেছেন। দলীয় সূত্র জানায়, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ঢাকা মহানগরের এক প্রভাবশালী নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তার নির্বাচনী এলাকার কয়েকটি ওয়ার্ডে স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি দেয়া হয়েছে। অথচ এ ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। দীর্ঘদিন ধরে তিনি রাজনীতি করছেন, কিন্তু এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। এ সময় তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে আরও দুই স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য বলেন, তাদের নির্বাচনী এলাকায়ও একই ঘটনা ঘটেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা বলেন, অবস্থা এখন এমন পর্যায় যে বাঁশের চেয়ে কঞ্চি মোটা হয়ে গেছে। এ কারণে, অনেক সিনিয়র নেতাকেও নিজ নির্বাচনী এলাকায় কমিটি গঠন বিষয়ে জুনিয়রদের পেছনে ঘুরতে হয়। এতে জুনিয়রাও বিষয়টি বেশ উপভোগ করেন। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা তো পাত্তাই দিচ্ছেন না। তাদের কোনো কথা বললে ‘ভাইয়ার’ নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছেন বলে মুখের ওপর বলে দেন। এভাবে চলতে থাকলে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়বে- যা দলের জন্য বড় ধরনের অমঙ্গল বয়ে আনবে। স্থায়ী কমিটি ও ভাইস চেয়ারম্যান পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান- জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কমিটি গঠনের দায়িত্বে রয়েছেন বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সাংগঠন সম্পাদক পর্যায়ের নেতারা। কোথাও কোথাও যুগ্ম-মহাসচিবদেরও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সংগঠন যুবদল ও সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের কমিটি করার জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্বে একাধিক বিভাগীয় টিম রয়েছে। পুনর্গঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। কমিটি গঠনের বিষয়ে সব নির্দেশনা দেন তিনি। কিন্তু যারা এসব কমিটি গঠনের দায়িত্বে আছেন তাদের অনেকেই নিরপেক্ষ নন। ইতোমধ্যে যুবদল ও ছাত্রদলের বেশ কয়েকটি টিমের বিরুদ্ধে স্থানীয় বিএনপির নেতাদের কারও কারও পক্ষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন।

তিনি বলেন, সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চালুর পর বিএনপিও তার গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন এনেছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দলের কমিটি গঠনে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিবেদিত সিনিয়র নেতাদের মতামত নিয়ে কমিটি করা উচিত। বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন পুনর্গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত একাধিক নেতা জানান, এমনও জায়গা আছে সেখানে ২০-২৫ বছর ধরেও কমিটি হয়নি। কোথাও কোথাও কমিটিও নেই। এসব কারণে স্থানীয় রাজনীতিতে এক ধরনের বন্ধ্যত্ব তৈরি হয়েছে। এ কারণে অভিযোগ একটু বেশি হচ্ছে। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ পদ আছে দুটি। প্রার্থী আছেন ১০-১৫ জন। দু’জনকে সন্তুষ্ট করা গেলেও বাকিরা তো নানা অভিযোগ তুলবেনই। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সম্পর্কে টিমের সদস্যদের কথা বলার ধরনের কারণেও সিনিয়র নেতাদের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে বলে মনে করেন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা।

জানতে চাইলে যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আমাদের সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছেন কীভাবে কমিটি করতে হবে। সবাইকে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বিএনপি একটি পরিবার। এ পরিবারকে শক্তিশালী করতে হবে। অঙ্গ সংগঠনের কমিটি গঠনে বিএনপির মতামত নিয়ে গ্রহণযোগ্য কমিটি করতে হবে। এরপরও কমিটি গঠনে যেসব অভিযোগ আসছে তা আমরা তাৎক্ষণিকভাবে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করছি। বিএনপির একজন সাংগঠনিক সম্পাদক জানান, অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদীয় আসনের যিনি সর্বশেষ প্রার্থী ছিলেন এবং বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অবশ্যই মতামত নিতে হবে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানেরও নির্দেশনা রয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে অভিযোগ আমরা পেয়েছি- এটা সত্য। এসব অভিযোগ হাইকমান্ডকে জানানো হয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের ২১টি ও দক্ষিণের ২৪টি থানা কমিটি করা হয়। অধিকাংশ থানা কমিটি গঠনে স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রার্থীদের ও বিএনপি নেতাদের কোনো মতামত নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি এসব কমিটি গঠনের পরপরই তা বাতিলের দাবিতে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভও করেছে থানাগুলোর নেতাকর্মীরা। বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে চিঠিও দিয়েছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।

সম্প্রতি ঢাকা মহানগরের কাফরুল থানা যুবদলের সভাপতি শরিফুল ইসলাম মিলনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

শরিফুল ইসলাম মিলন বলেন, আমাকে কোনো কারণ ছাড়াই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কারের পেছনে কারও ইন্ধন থাকতে পারে। তিনি বলেন, অথচ করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) প্রার্দুভাবের মধ্যেও মাঠ থেকে তিনি দলের জন্য কাজ করেছেন। এ সময়ে প্রায় ১৭ হাজার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। আমি দলের হয়ে ২৩ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছি। কাফরুল থানা যুবদলে দুই বছর ধরে সভাপতি হিসেবে কাজ করেছি। এর আগে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম।

Sharing is caring!