আমার লাল গোলাপটি হলো আমার একান্ত আদরের বৌমা “হালিমা আক্তার মিথিলা”। মিথিলা শুরু থেকেই আমাকে “বড়বাবা” বলে ডাকত। মিথিলাকে ঘরে তুলেছিলাম আমার ছোটভাই জাহাঙ্গীরের একমাত্র ছেলে, আমার একান্ত আদরের ভাতিজা যাকে ছোটবেলা থেকে আমি লালন পালন করে বড় করেছি, নিজ কলেজে রেখে নিজের হাতে পড়ালেখা শিখিয়েছি, মিথিলার সাথে বিয়ে বন্ধনের মাধ্যমে। তাদের বিয়ে হয় আনুমানিক বছরখানেক পূর্বে।

বৌমা মিথিলার বয়স তখনও ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি, যার কারণে আমরা ঐ বিয়ের কাবিননামাও রেজিস্ট্রেশন করতে পারিনি। টার্গেট ছিল যখন মিথিলার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হবে তখনই রেজিস্ট্রেশনের কাজটি সেরে নেব।আমরা যথারীতি বিয়ের শুভ কাজটি সেরে ফেলি। এই অবস্থায় মিথিলার বাবা-মা মিথিলাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল।

পরবর্তীতে, গত ১১ই জানুয়ারী, ২০২০ তারিখে ঘটা করে আমার নিজ গ্রামের বাড়ী হাজীগঞ্জের ভাটরা গ্রামে “সবুজ ও মিথিলার”বৌভাত অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করি। কিন্তু নিয়তির কি খেলা গত রোজার ঈদের কয়েকদিন পূর্বেই মিথিলা অসুস্থ হয়ে আমার নিজ হাসপাতাল এর এ্যাম্বুলেন্স করে ঢাকা আসে।আমরা তাকে ৩-৪ টি হাসপাতাল পরিবর্তন করে সর্বশেষ ঢাকার বিখ্যাত কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করি।

প্রাথমিক অবস্থায় মিথিলা হাসপাতালে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্ট ও জন্ডিসের সমস্যা নিয়ে। প্রতিদিন মিথিলার প্রায় ১৫-২০ টি অক্সিজেন সিলিন্ডারের প্রয়োজন হতো। এ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করেছিলাম মূলত ICU Facilities এর কারণে। অনেক চেষ্টাও করেছিলাম ICU পাওয়ার জন্য। বেশ কয়েকবার তদবির করে ICU-র বেডেও তাকে নেয়া হয়েছিল কিন্তু অন্যদের তদবিরের তাড়নায় ৫-১০ মিনিটের মধ্যেই মিথিলা বেড থেকে নেমে আসতে বাধ্য হয়।

এক পর্যায়ে, মিথিলার শ্বাসকষ্ট ও জন্ডিসের সাথে আন্তর্জাতিক মরনব্যাধি (COVID-19) করোনা যোগ হয়। তাকে সার্বক্ষনিক পরিচর্যার কাজে নিয়জিত ছিলেন ভাতিজা সবুজ, তার শ্বশুর জনাব মোবাশ্বের হোসেন মোল্লা ও শ্বাশুড়ী রাহিমা বেগম। মিথিলার মা বাবা নিরলসভাবে যথেস্ট চেষ্টাও করেছেন মিথিলাকে সুস্থ করতে। তাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না। মৃত্যুর সাথে বেশ কয়েকদিন পান্জা লড়ে অবশেষে গত ৫ই জুন,২০২০ শুক্রবার সকাল আনুমানিক ছয় ঘটিকার সময় আমাদের সকলকে হতবাক করে দিয়ে চিরবিদায় নিয়ে না ফেরার রাজ্যে চলে গেল মিথিলা। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই মিথিলা আমার ও আমাদের পাটওয়ারী পরিবারের সকল সদস্যের মন কেড়ে নিয়েছিল। সময় অল্প হলেও তার স্মৃতিগুলি মনে হয় বহুবছরের ও বহু পুরাতন। মিথিলার স্মৃতিচারণ করে শেষ করা যাবেনা। তবুও অনেকগুলো স্মৃতির মধ্য থেকে একটি বলছি-

রোজার মাঝামাঝিতে হঠাৎ একটা ফোন আসল-

– “বড় বাবা কেমন আছ? “
– কে? মিথিলা নাকি?
– “হ্যা বাবা, তোমার শরীরটা কেমন আছে? শুনো, ঈদে কিন্তু আমার বাড়ীতে তোমাদের দাওয়াত। আমি নিজে তোমাদের রান্না করে খাওয়াবো। আমি নতুন করে রান্না করা শিখছি।”
– তোমার বাড়ীতে দাওয়াত ? কোন বাড়ী?
– “কেন বড় বাবা? আমার বাড়ী তো এখন ভাটরা। আমার শ্বশুর বাড়ী-ই এখন আমার বাড়ী।”

এত মিস্টি করে বলা কথাটা কান থেকে সরাতে পারছি না। জীবনে কোনো শাড়ী বা লেহেঙ্গা একা কিনেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু, তাদের বিয়ের পূর্বে চেন্নাইতে ISAME ফোরাম- এ যেয়ে নিজ পছন্দে আমার মিথিলা মার জন্য একটা লেহেঙ্গা কিনে বৌভাতে সারপ্রাইজ দিয়েছিলাম। ও কেমন করে, কিভাবে, কখন যে মনের অজান্তেই মেয়ের আসনটা দখল করে নিয়েছিল ভাবতেই পারিনি।

আমি অসুস্থ, সেটা ভুলে গিয়েই তাকে নিয়ে হাসপাতাল দৌড়িয়েছি। বিভিন্ন ডাক্তারের সাথে কথা বলেছি, করেছি মনোবিজ্ঞানীদের সাথে কাউন্সিলিং।

চেস্টা করেছি ঠিক বাবার মতই দায়িত্ব পালন করতে। কিন্তু, করোনার ভয়ংকর থাবা থেকে তাকে বাঁচাতে পারিনি। আল্লাহর কাছে তাকে চেয়েও পারিনি আমাদের কাছে রেখে দিতে।

এত অল্প সময়ের মধ্যেই কেমন করে যেন তুই হয়ে ছিলি আমাদের নয়নমনি। সূর্যের কিরণ দেয়ার আগেই অন্ধকারের কালো মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেল প্রানবন্ত এক প্রাণ।

তুই স্নিগ্ধ ছায়ার শীতলপাটীতে ঘুমিয়ে থাক, মা। তুই অনেক ভাগ্যবান, যে কিনা পেয়েছিস শহীদের মর্যাদা। ওপারে ভালো থাকিস মা।
ইতি,

তোর বড় বাবা
ড. এম এ হালিম পাটওয়ারী

হায় নিয়তির কি খেলা- আমার লাল গোলাপটি প্রস্ফুটিত হওয়ার পূর্বেই ঝরে গেল!

Abdul Halim Patwary ফেইসবুক থেকে।

Sharing is caring!