সকাল বেলা ঔষুধের জন্য বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় ঔষুধ ক্রয় করে, কিছু সরকারি ঔষুধের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিকে যাওয়ার পথেই অঝরে শুরু হয় বৃষ্টি। দাঁড়ালাম রাস্তার পাশে একটি গাছের নিছে, বৃষ্টি বাড়তে থাকলে পাশের একটি ঘরের সামনে দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম, এমন সময় আমার চোখে চোখ পড়ে আমার বাবার ছোট বোন, ছোট ফুঁপি ছকিনা বেগমের। বৃদ্ধা চোখের, দৃষ্টিতে দূর থেকে আমাকে ছিনতে বিন্দুমাত্রা কষ্ট হয়না তার। পাশেই তার বাড়ি। দৌড়ে এলো আমার কাছে।

চোখ দিয়ে পানি ঝড়তে লাগলো তার, কাঁদতে শুরু করলো আমাকে ধরে। বললো, বাবা চল বাড়ি চল, এখানে দাঁড়িয়ে আছস কেন, ফুঁপির বাড়ি গেলে কি হয়, আমি অনিহা প্রকাশ করে বললাম, না ফুঁপি এখন যাবো না, বৃষ্টি থামলে চলে যাবো, একটু তাড়া আছে। ফুঁপি, না বাবা, এখানে দাঁড়িয়ে থাকবি কেন, আমার বাড়িতে চল, ফুঁপির পিড়াপিড়িতে শেষ পর্যন্ত যেতে হলো । হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন তার ঘরে, বৃষ্টি বাড়তে লাগলো, ফুটি আমার মাথায় যেন বৃষ্টির পানি না পড়ে,সেজন্য নিজের পড়নের কাপড় আমার মাথার উপর দিয়ে ডেকে নিয়ে গেলো। ভাবলাম, এটা রক্তের টান, রক্তের সম্পর্ক।

রক্ত কখনো মানুষকে পর করেনা, মান অভিমান থাকতেই পাড়ে। ফুঁপির বাড়ির পাশ দিয়ে প্রায় যাতায়েত হয় আমার, কিন্তু কখনো যাওয়া হয়নি, ফুঁপির বাড়ির পাশ দিয়ে যখনি যেতাম, তখনি আমার আঁখি দুঠো চলে যায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ফুঁপির বাড়ির দিকে। আত্মীয়ের সম্পর্ক নিভির ভাবে রাখার জন্য যাতায়েত রাখা যে কতটুকু প্রয়োজন, অনুভব করলাম সেদিন। রক্ত কখনো মানুষকে পর করেনা। কি এক অনুভুতি, ফুঁপির আদর যত্ম, মায়া মমতা, সত্যি এক বিরল ইতিহাস। আমার চার ফুটি এখনো এক ফুঁপির বাড়িতে যাওয়া হয়নি। বাকি ফুুঁপিদের বাড়িতে দুই একবার যাওয়া হয়েছে, তা ও অনেক আগে। কেন যেন এ দূরত্ব, ভাবতে পারছিনা। বাবার বোন, আমার ফুঁপি, এত আদর যত্ন আর কোথায় ও পাওয়া যাবে কি?

এমন ভাবনা চলে আসে মনের অজান্তে। ফুঁপির ভালবাসার অনুভূতি মনে থাকবে, অামার মত হয়তো অনেকেই ফুঁপির বাড়িতে যাওয়ার প্রবনতা নেই, তারা যদি কাকতালীয় ভাবে কোন দিন যেতে পারে, তাহলে ফুঁপিদের ভালবাসার গভীরতা অনুভব করতে পারবে। সৃষ্টিকতা পৃথিবী সৃষ্টি করে মানব সম্প্রদায়কে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব ঘোষনা করেছে। আত্মীয়, পরিজনের সাথে সু-সম্পর্ক রাখার কথা বলেছে, কিন্তু আমরা কি তা করছি! বিভিন্ন কারনে অকারনে আমরা রক্তের সম্পর্ক ভুলে নিজের মত করে জীবন চালাচ্ছি। এটা আমি না পৃথীবির অধিকাংশ মানুষই করে থাকে।

ফুঁপিদের সাথে আমাদের সমাজে ভাইদের সাথে দূরত্ব বাঁধে একটাই কারন, তার কারন কারও জানা বাকি নেই। আমাদের সাথে ফুঁপিদের কোন বিবেদ নেই,  কারন আমার বাবা জেটাদের ছিলনা কোন প্রকার ধন সম্পদ, এর পেছনেও অনেক কারন। সেটা নাই বললাম, আমার দাদার  ৩ ছেলে ৪ মেয়ে। ২ ছেলে নিজের বসত ঘরের সম্পদ নিজেদের ক্রয় করতে হয়েছে। একজনকে একে বারে যত সামান্য সম্পদ একজন দান করেছে। এর জন্য দাদা বৃন্দু মাত্রাও দায়ী ছিলনা। সমাজের সাথে যুদ্ধ করে চলতে গিয়ে বাবাকে কঠোর ভাবে পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমরা ৫ ভাই ২ বোন,বাবা মাসহ ৯ জনের সংসার। বাবা পরিশ্রম, মার কষ্টের অন্ত ছিলনা। আমার আর আমার বড় ভাইয়ের বয়স যখন ৭/৮ বছর হবে, তখন থেকেই আমরা  পরিশ্রম শুরু করি, একদিকে লেখা পড়া, অন্য দিকে সংসারে বাবাকে সহযোগীতা করতে দিন মজুরের শ্রমিক হিসেবে আমাদেরকে ও পরিশ্রম শুরু করতে হয়েছে। এজন্যই হয়তো বা আমাদের সাথে ফুঁপিদের দূরত্ব সৃষ্টি হয় ।

এবার বলছি সেদিনের কথা, ১৭ জুন, বুধবার, ২০২০।  আর্শিবাদের বৃষ্টির কারনেই আমার যাওয়ার হল ফুঁপির বাড়িতে। ফুঁপির ঘরে বসা মাত্রাই আপায়নের ত্রুটি নেই। বাবার, মা, আমার পরিবারসহ সকলের খোঁজ খবর নিতে থাকে। বাবার জ্বর হয়েছে, জ্বর কমলে ও কাশিটা কমেনি, শুনেই তিনি বললেন, তুই যাওয়ার সময় আবার আইস, এর ফাঁকে আমি বিভিন্ন জিনিস দিয়ে কাশের ঔষুধ বানিয়ে রাখবো, নিয়া যাইস, কয়েক বার খেলেই ভাল হবে। এর ফাকে আমি ও শারীরিক ও সাংসারিক খোঁজ খবর নিয়ে নিলাম। অঝরে বৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ কথা হয় ফুঁপির সাথে, ভাল লাগার অন্তঃনেই। ধীরে ধীরে বৃষ্টি কমলো।

বৃষ্টি কমলে চলে আসার সময় অনেক অনুরোধ, বাবা ক’টা ভাত খেয়ে যা, আমি তোরে খাওয়াইয়া দিমু, কখনো তো, আইওসনা, ব বাবা, ক’টা ভাত খা। অনেক অনুরোধ করে ভাত না খেয়ে চলে আসলাম। আসার সময় ফুঁপি আবার অনুরোধ করলো বাবা যাওয়ার সময় আইস। ফুঁপি তোর জন্য অপেক্ষা করবো।
কাজ শেষ করে বাড়ি চলে এলাম, আসার পথে শুধু ফুঁপির কথাই মনে পড়লো, বাড়িতে এসে জোহরের নামাজ পড়ে খাওয়া দাওয়া শেষ করে পরিবারের সকলের কাছে বললাম ফুঁপির বাড়ির যাওয়ার কথা। সবাই তখন হাসি দিয়ে বললো এটাই রক্তের সম্পর্ক, রক্তের টান, রক্ত কখনো মানুষ অস্বিকার করতে পারেনা। এটাই বিধাতার নিয়ম, বিধাতার ধরনীর বৈচিত্র।

Sharing is caring!