উপ-সম্পাদকীয়বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিশিক্ষা

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ, এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেয় ইসলাম

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে প্রতিটি দেশের মানুষই আজ আতঙ্কিত। মনের মধ্যে ক্ষণেক্ষণে শঙ্কা বেড়েই চলেছে বেঁচে থাকা নিয়ে।

সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের চেষ্টা করছেন সবাই, যেন জীবাণুবাহী করোনা তাকে আক্রান্ত না করে। কারণ, এখনও পর্যন্ত এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের কোনো ভ্যাক্সিন বা ওষুধ আবিষ্কার হয়নি।

গবেষকরা বলছেন, করোনা প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকরী ওষুধ হল নিজেকে সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, বারবার হাত ধোয়া। লক্ষনীয় হল, এটা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত এবং অবশ্যপালনীয় বিধান।

পবিত্র থাকার ব্যাপারে কুরআন ও হাদিসের বিভিন্ন জায়গায় বারংবার উৎসাহিত করা হয়েছে এবং যারা পূতপবিত্র থাকবে, তাদের জন্য প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে প্রভূত কল্যাণ ও সওয়াবের।

মদিনার নিকটবর্তী কুবা এলাকার লোকজন পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করত। তাদের ভূয়সী প্রশংসা করে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সেখানে এমন লোকেরা রয়েছে, যারা ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করতে পছন্দ করে । আর আল্লাহ তায়ালা পবিত্রতা অর্জনকারীদের পছন্দ করেন ।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ১০৮)

আরও বর্ণিত আছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২২)

প্রিয়নবী (সা.) বলেন, তোমরা তোমাদের উঠান ও আঙিনা পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি করে রাখো।

ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হল নামাজ, এই নামাজের জন্য পূর্বশর্ত আরোপ করা হয়েছে পবিত্রতা(অজু) অর্জনকে। আরেক হাদিসের মধ্যে পবিত্রতাকে ঈমানের অর্ধেক বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

হযরত আবু মালেক আশআরি (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক।’ (মুসলিম, হাদিস : ২২৩)

আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে মুমিনগণ, তোমরা যখন নামাজের জন্য প্রস্তুত হবে, তখন নিজেদের মুখমণ্ডল ও হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করবে, মাথা মাসেহ করবে এবং পা গ্রন্থি পর্যন্ত ধৌত করবে; যদি তোমরা অপবিত্র থাকো, তবে বিশেষভাবে পবিত্র হবে। তোমরা যদি পীড়িত হও, কিংবা পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করে নিবে। (সূরা: মায়িদাহ, আয়াত: ৬)

নবী (সা.) বলেন, নামাজ বেহেশতের চাবি; অজু (পবিত্রতা) নামাজের চাবি। (মিশকাত)

আল্লাহ তায়ালা পবিত্রতা অর্জনের সরাসরি নির্দেশনা দিতে গিয়ে বলেন, হে বস্ত্রাচ্ছাদিত, উঠুন, সতর্ক করুন; এবং আপনার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন। আপনার কাপড় পবিত্র রাখুন, অপবিত্রতা পরিহার করে চলুন। (সূরা: মুদ্দাছছির, আয়াত: ১-৪)

পশ্চিমা দেশগুলোতে মানসিক রোগী ও হতাশাগ্রস্ত লোকদের সংখ্যা করে বেড়েই চলেছে। পাগলাগারদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই মানসিক রোগ ও হতাশাগ্রস্ত লোকদের নিয়ে গবেষণাও হচ্ছে অধিক পরিমাণে।

এক মার্কিন গবেষক তার প্রবন্ধে লিখেছেন, আমি ডিপ্রেশন (মানসিক রোগে) আক্রান্ত কয়েকজন রোগীকে প্রতিদিন পাঁচবার মুখ ধৌত করিয়েছি। কিছুদিন পরে তাদের রোগ কমে যায়। অতপর, আরও কিছু রোগীদের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি অনুসরণ করলাম এবং সেই সঙ্গে দিনে পাঁচবার হাত, মুখ ও পা ধোয়ার ব্যবস্থা করলাম। এবার তারা অনেকটাই সুস্থ হয়ে গেলেন। এই গবেষক তার প্রবন্ধের উপসংহারে অকপটে স্বীকার করেছেন, মুসলমানদের মধ্যে মানসিক রোগ কম দেখা যায়। কারণ, তারা দিনে কয়েকবার হাত, মুখ ও পা ধুয়ে থাকে। উচ্চ রক্তচাপের সহজ ওষুধ হল অজু।

এক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অত্যন্ত আত্মপ্রত্যয় ও দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন; উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীকে প্রথমে অজু করিয়ে দিন, তারপর ব্লাড প্রেসার পরীক্ষা করুন, দেখবেন প্রেসার নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।

এক মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ মুসলিম গবেষক বলেন, মানসিক রোগের কার্যকরি চিকিৎসা হলো অজু।

পশ্চিমা দেশের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা রোগীদের শরীরে অজুর মত করে দিনে কয়েকবার পানি ঢেলে দেন। এতে রোগের উপশম হয় দ্রুত ।

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার আরেকটি উপায় হল গোসল। এটিও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশিকা ও ইবাদত। সপ্তাহে ন্যূনতম একবার হলেও গোসল করাকে আবশ্যক করে দেয়া হয়েছে ইসলামে।

হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, জুমুআর দিন (শুক্রবার) গোসল করা প্রতিটি সাবালক ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব। (বুখারি, হাদিস: ৪৭৯)

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালার জন্য প্রতিটি মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য হলো (অন্তত) প্রতি সাত দিনের মাথায় নিজের মাথা ও শরীর ধৌত করা। (বুখারি, হাদিস : ৮৯৭; মুসলিম, হাদিস : ৮৪৯)

মুখের যত্ন নেয়া ও দাঁত পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে প্রিয় নবী (সা.) বলেন, মিসওয়াক করলে যেমন মুখ (গাছের ছোট ডাল যা দাঁত মাজতে ব্যবহৃত হয়) পরিষ্কার ও পবিত্র হয়, তেমন আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনেরও কারণ হয়। (আন- নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)

হযরত আবু হুরায়রা ( রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যদি আমার উম্মতদের ওপরে বেশি কষ্টসাধ্য না হয়ে যেত, তাহলে আমি তাদেরকে প্রত্যেক নামাযের পূর্বে মিসয়াক করার নির্দেশ দিতাম। ( বুখারি এবং মুসলিম )

নিয়মিত মিসওয়াক করলে স্মরণশক্তি বৃদ্ধি পায়, মাথা ব্যথা দূর হয় এবং মাথার রগগুলোতে প্রশান্তি আসে। এতে শ্লেষ্মা (কফ, সর্দি) দূর হয়, দৃষ্টি শক্তি তীক্ষ্ম হয়, পাকস্থলী ঠিক থাকে এবং খাবার সহজে হজম হয়ে যায়, বিবেক বৃদ্ধি পায়। সন্তান প্রজননে বৃদ্ধি ঘটায়। বার্ধক্য দেরীতে আসে এবং পিঠ মজবুত থাকে। (হাশিয়াতুত তাহতাভী, আল মারাকিল ফালাহ, ৬৮ পৃষ্ঠা)

রাসুল (সা.) যখন ঘরে প্রবেশ করতেন তখন সর্বপ্রথম মিসওয়াক করতেন। (সহীহমুসলিম শরীফ, ১৫২ পৃষ্ঠা, হাদীস- ২৫৩)

তিনি যখন ঘুম থেকে জাগ্রত হতেন, তখনও মিসওয়াক করতেন। (আবু দাউদ, ১ম খন্ড, ৫৪ পৃষ্ঠা, হাদীস-৫৭)

বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার বিকল্প নেই। নিজে এবং নিজের আশপাশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে সবসময়।

তাই আসুন, ইসলামের এই অনবদ্য আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজে ভালো থাকি এবং অপরকে ভালো রাখি!

লেখক: তরুণ আলেম ও সংবাদকর্মী

muhammadbinwahid96@gmail.com

Sharing is caring!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
shares
Close